বাক্কালির অন্তর্গত প্রকৃতির কাছে কি পেলেন ইয়াসির?

বে ইনসাইট ডেস্ক

কক্সবাজারকে আমরা সাধারণত সমুদ্রের শহর হিসেবেই চিনি। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, পর্যটকের ভিড়, হোটেল-রিসোর্ট কিংবা রঙিন সূর্যাস্ত; এসবই যেন কক্সবাজারের পরিচয়ের প্রধান উপাদান। অথচ এই শহরের আরেকটি মুখ আছে, অনেক বেশি নীরব, অনেক বেশি অন্তরঙ্গ। সেই মুখটি দেখা যায় বাঁকখালী নদীর পাড়ে, ঘাসের ফাঁকে, ঝোপঝাড়ের ভেতর কিংবা বৃষ্টিভেজা চরাঞ্চলে ফুটে থাকা নাম না জানা ফুলগুলোর মধ্যে।

শিল্পী ইয়াসির আরাফাত সেই নীরব সৌন্দর্যকেই তুলে এনেছেন তাঁর তুলিতে আঁকা চিত্র প্রদর্শনী ‘বাক্কালির ফুল ও অন্যান্য’-এ।

কক্সবাজার শহরের অলিগলি, নদীতীর আর জনজীবনের ভেতর দিয়েই কেটেছে ইয়াসিরের শৈশব-কৈশোর। করোনাকালে যখন মানুষের চলাফেরা সীমিত হয়ে গিয়েছিল, তখন তিনি হাঁটতে শুরু করেন বাঁকখালীর পাড় ধরে। সেই হাঁটায় তিনি আবিষ্কার করেন এক বিস্মৃত জগৎ। নদীর তীরে, পতিত জমিতে, কাদামাটির পাশে কিংবা ঘাসের ভেতর ফুটে থাকা অসংখ্য বুনো ফুল তাঁর চোখের ল্যান্সে ধরা পড়তে থাকে। করোলা ফুল, কলমি ফুল, ঘাসফুল, ত্রিধারা, কানাইবাসী; কত নাম জানা, কত নাম অজানা ফুল।

ইয়াসিরের কাছে এই প্রদর্শনী শুধু ফুলের ছবি প্রদর্শন নয়; এটি এক ধরনের আর্কাইভ নির্মাণের প্রচেষ্টা। এমন সব ফুল, যাদের জন্য কোনো ফুলদানি সাজানো হয় না, কোনো প্রেমিক তার প্রেমিকাকে উপহার দেয় না, যাদের সৌন্দর্য নীরবে জন্ম নেয় এবং নীরবেই ঝরে যায়; তাদের অস্তিত্ব সংরক্ষণের প্রয়াস।

এই ভাবনা থেকেই তিনি লিখেছিলেন একটি পঙ্‌ক্তি-

“যে ফুল পায়নি খোপা কিংবা কোনো দানি,
সেও পেয়েছিল সূর্য, আকাশ ও পানি।”

প্রদর্শনীর একটি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ইয়াসির বলছিলেন মহিষের কথা। শহীদ মিনারে ছবি নিয়ে প্রবেশ করার সময় এক পথচারী ছবির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, “ভাই, দাম হতো?”

প্রশ্নটি ছিল সরল, কিন্তু ইয়াসিরের কাছে ছবিটি ছিল একটি গল্প। কক্সবাজারের স্থানীয় ভাষায় একটি শব্দ আছে- ‘ঢেরা পইজ্জা’। গ্রামের উঠানে কিংবা পাড়ার আড্ডায় যখন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিশ্চিন্তে বসে থাকে, কোনো তাড়া নেই, কোনো ব্যস্ততা নেই, সেই অলস নিশ্চিন্ত অবস্থাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় শব্দটি। মহিষের সেই ছবিটি তাঁর কাছে ছিল ঠিক তেমনই এক ‘ঢেরা পইজ্জা’-এর প্রতীক। যেন জীবনানন্দ দাশের ‘অবসরের গান’-এর দৃশ্যমান রূপ; যেখানে সময় ধীরে বয়ে যায়, আর প্রকৃতি নিজের ছন্দে বেঁচে থাকে।

ইয়াসিরের কাজের একটি বিশেষ দিক হলো স্থানীয় ভাষা, প্রকৃতি ও স্মৃতিকে একই সুতোয় গেঁথে ফেলা। তাঁর ছবিতে শুধু ফুল বা নদী নেই; আছে কক্সবাজারের মানুষের জীবনবোধ, লোকজ শব্দ, গ্রামীণ অনুভূতি এবং হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক উপাদান।

এর আগে ‘কক্সবাজার ডায়েরিজ’ প্রদর্শনীতে তিনি শহরের স্থাপত্য ও জনজীবনের ছবি তুলে ধরেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতার পরবর্তী অধ্যায় যেন ‘বাক্কালির ফুল ও অন্যান্য’। শহরের দৃশ্যমান পরিচয় থেকে এবার তিনি চলে এসেছেন শহরের অন্তর্গত প্রকৃতির কাছে।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, প্রদর্শনীটি এমন এক উন্মুক্ত পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে যেখানে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রবেশ করতে পারছেন। যারা সচরাচর গ্যালারিতে যান না, তারাও থেমে ছবি দেখছেন, প্রশ্ন করছেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন। শিল্পী হিসেবে এটাই ইয়াসিরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

কক্সবাজারের গল্প শুধু সমুদ্রের নয়। এই শহরের গল্প বাঁকখালীরও, ঘাসফুলেরও, বুনো কলমিরও। সেই গল্পগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক ছিল, অদেখা ছিল। ইয়াসির আরাফাতের ক্যামেরা সেই অদেখা জগতের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায়।

সমুদ্রের শহরের ভেতরে যে আরেকটি ফুলের শহর লুকিয়ে আছে, ‘বাক্কালির ফুল ও অন্যান্য’ যেন সেই শহরেরই এক নীরব মানচিত্র।

কোরবানি ছাড়াই ঈদ: রেশন কমায় ম্লান রোহিঙ্গা শিবিরের উৎসব

কক্সবাজার । বে ইনসাইট

টেকনাফের ২৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করেন ইয়াসিনতারা। এবারের ঈদে কোরবানি দেওয়ার কথা তাঁর কাছে এখন কল্পনার মতো।

তিনি বলেন, “আগে যখন মাথাপিছু ১২ ডলার করে খাদ্য সহায়তা পেতাম, তখন চাল-ডাল থেকে একটু বাঁচিয়ে মাছ বা মাংস কিনতে পারতাম। এখন ১০ ডলার দিয়ে কিছুই বাঁচে না। গরুর মাংস কেনা সম্ভব না। ঈদের দিন হয়তো একটা ব্রয়লার মুরগি কিনেই উৎসব বলতে হবে।”

ইয়াসিনতারার মতো একই বাস্তবতায় আছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের অধিকাংশ মানুষ। এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমের কাছে এবারের ঈদ সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে কঠিন সময় হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার কোরবানি তো দূরের কথা, পরবর্তী খাবার নিয়েই অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

গত এপ্রিল থেকে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। আগে সব পরিবার সমানভাবে মাথাপিছু ১২ ডলার পেত। এখন ঝুঁকি ও অসহায়ত্বের মাত্রা অনুযায়ী সহায়তা ভাগ করা হয়েছে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো পাচ্ছে মাথাপিছু ১২ ডলার, মাঝারি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো ১০ ডলার এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো পাচ্ছে মাত্র ৭ ডলার।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “ক্যাম্পের প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ আগের ১২ ডলারের কম সহায়তা পাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ পরিবার ১০ ডলার এবং ১৭ শতাংশ পরিবার ৭ ডলার পাচ্ছে। আগের তুলনায় বড় একটি অংশ এখন কম বাজেটে চলতে বাধ্য হচ্ছে।”

মা-বাবা ও চার বোনকে নিয়ে বসবাস করা রেজওয়ান জানান, তাঁদের পরিবার এখন মাথাপিছু ৭ ডলার সহায়তা পায়।

তিনি বলেন, “ঈদ উদযাপন এখন স্বপ্নের মতো। ঈদের আগে কিছু টাকা জোগাড় করতে পারলে হয়তো একটু গরুর মাংস কিনতে পারব, কিন্তু কোরবানি দেওয়া সম্ভব না।”

আগের সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “১২ ডলার পেলে কোনোভাবে সংসার চলত। এখন যা পাই, তাতে ঠিকমতো খাবারই জোটে না। কিছুদিন না খেয়েও থাকতে হয়। এই অসহায় অবস্থা থেকে কবে মুক্তি পাব জানি না।”

ক্যাম্প-২৭ এর মাঝি মো. কালাম বলেন, যাদের বিদেশে আত্মীয়স্বজন আছেন তারা ভাগে কোরবানিতে অংশ নিতে পারছেন। অল্প কিছু সচ্ছল ব্যক্তি আলাদাভাবে গরু কোরবানি দিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ মানুষের জন্য সেটিও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, “কখনও কখনও প্রায় ১০০ জন মিলে এক লাখ টাকার একটি গরু কিনে ভাগ করে নেয়। খাদ্য সহায়তা কমার পর এটাই প্রথম ঈদ, তাই মানুষের কষ্ট অনেক বেড়ে গেছে।”

আরআরআরসি কার্যালয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন এনজিও সংস্থাও এবার কোরবানির গরু ও মাংস বিতরণের পরিমাণ কমিয়েছে।

তবে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, অন্তত ন্যূনতম পর্যায়ে মাংস বিতরণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, “প্রায় এক মাস আগে অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় পরিমাণ কম হলেও আমরা চেষ্টা করছি প্রতিটি পরিবারকে অন্তত এক কেজি মাংস পৌঁছে দিতে।”

তিনি জানান, মূলত বিভিন্ন ইসলামিক সংস্থা কোরবানির পশুর ব্যবস্থা করছে।

তবে টেকনাফ এলাকার ক্যাম্পগুলোতে সহায়তা পৌঁছানো কঠিন বলে উল্লেখ করেন আরআরআরসি।

তিনি বলেন, “ওই এলাকায় যাতায়াত খরচ বেশি। ফলে অনেক সংস্থা সেখানে যেতে আগ্রহ দেখায় না।”

আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সংকট তৈরি হওয়ায় দাতাদের মনোযোগও বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে।

“মানুষের আবেগ বা মনোযোগ সবসময় এক জায়গায় থাকে না। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থাও এখন অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।”

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়েছে।

তিনি বলেন, “ঈদের দিনে সন্তানদের প্লেটে কোরবানির মাংস তুলে দিতে না পেরে অনেক বাবা-মা হতাশায় ভুগছেন।”

তবে জুবায়েরের মতে, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত আনন্দের ঈদ হবে তখনই, যেদিন তারা নিজ ভূমি রাখাইনে নিরাপদে ফিরতে পারবে।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ অঞ্চল গঠন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

এদিকে মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র যখন ঈদ উৎসবের প্রস্তুতি চলছে, তখন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে শোনা যাচ্ছে ভিন্ন এক বাস্তবতার গল্প—দীর্ঘ বাস্তুচ্যুতি, কমে আসা সহায়তা আর টিকে থাকার সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষের নীরব ঈদের গল্প।

কক্সবাজারে ‘নিউ-মিডিয়া’র সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বিপুল

আলতাফ পারভেজ

বাংলাদেশে অনেক পত্র-পত্রিকা। জনসংখ্যার তুলনায় বেশি নয়, কিন্তু সক্রিয় পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের তুলনায় কম নয়। বিজ্ঞাপনের বাজারের তুলনায়ও অনেক।

তাছাড়া যেকোন নতুন মিডিয়া হাউস মানেই নতুন এক দল কর্মীর প্রয়োজনীয়তা। নতুন নতুন আইডিয়া। সেরকম কারিগরী জনসম্পদ ও ভাবসম্পদ খুব বেশি নেই এদেশে। অনেক চাকুরিপ্রার্থীর ভিড় আছে বটে, কিন্তু মিডিয়ার কাজ স্রেফ চাকুরি করা তো নয়। ফলে নতুন গণমাধ্যমের আয়োজন মানেই গতানুগতিক কিছু দেখার শঙ্কা।

তবে অনেকে এর মাঝেও ব্যতিক্রমী কিছুও করছেন। সেই সূত্রে সামনে, এই জগতে সৃজনশীলতা ও দক্ষতার একটা প্রতিযোগিতাও হবে। সেই দৌড়ে সবাই হয়তো টিকবে না। কেউ কেউ এগিয়ে যাবে, মনযোগ আকর্ষন করবে। পাঠক-শ্রোতা-দর্শকও গুণে এবং পরিমানে পাল্টাবে।

আপাতত অবশ্য ভাইরালপণার জোয়ার বইছে, সত্য-মিথ্যার ফারাক করাও বেশ দুরূহ হয়ে যাচ্ছে এবং স্থুলতার জয়-জয়কার চলছে। কবে এই জোয়ারের উপাদান ও ধরন বদলাবে বলা মুশকিল। একসময় নিশ্চয়ই ভোক্তার ক্ষুধা পাল্টাবে। কখন ও কীভাবে সেটা ঘটবে আমরা জানি না।

এরকম প্রত্যাশার মাঝেই জানলাম, কক্সবাজার থেকে একদল সংস্কৃতিকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মী মিলে নতুন গণমাধ্যম গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।

বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে ‘কেন্দ্রে’র বেশ দাপট। প্রান্ত এখানে ‘মফস্বল’। কক্সবাজার নিশ্চিতভাবে সেরকম মফস্বল নয়। বহুকারণে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের এই জনপদ আঞ্চলিক এক রাজধানীর মতো।

কক্সবাজারের ফরমাল ও ইন-ফরমাল ইকোনমি আয়তনে বিশাল। আমরা হয়তো প্রথাগত হিসাবপত্তরে তার তলদেশ খুঁজেও পাবো না। এর উপত্যকা আন্তর্জাতিক ঠান্ডাযুদ্ধের একটা ছোটখাটো ভরকেন্দ্র হয়ে উঠছে।

কক্সবাজারের পাশে আরাকান, চিন, মিজোরামসহ নর্থ-ইস্ট, পার্বত্য চট্টগ্রাম বৈশ্বিক মনযোগে রয়েছে সর্বক্ষণ। এখানকার আলো-হাওয়ায় বহু জাতি আর অনেক ধর্মের মানুষের চাওয়া-পাওয়া-হতাশা-প্রত্যাশার আদান-প্রদান চলছে। সামনের দিনগুলোতে যে প্রক্রিয়া আরও বাড়বে। আসন্ন সে-ই দিনগুলোর চেহারা কীরকম হবে আমরা এখনি তা অনুমান করতে পারবে না, কিন্তু নানান ধরনের রাজনৈতিক ও জাতিগত ঘটনাপ্রবাহ দেখবো আমরা কক্সবাজার ও সন্নিহিত জনপদে।

এরকম একটা জায়গায় গণমাধ্যম বা প্রচার মাধ্যমে দুর্দান্ত কাজ করার সুযোগ আছে। এটা হতে পারে বাংলাদেশের গতানুগতিক মিডিয়া জগতের ব্যতিক্রমী কিছু। যাকে আমরা বলতে পারি প্রকৃত ‘নিউ মিডিয়া’। পরিবেশ থেকে ভূ-রাজনীতি বহু বিষয়ে কক্সবাজারের মিডিয়াকর্মীদের কাজের পরিসর অনেক ব্যাপক এবং গভীর।

এই জেলার যেকোন ‘নিউ মিডিয়া’র দিকে চোখ থাকবে আকিয়াব থেকে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত সবার। একে নজরে রাখবে ভূ-রাজনৈতিক পরাশক্তিগুলো। পর্যটন ও ব্লু ইকোনমির সূত্রে কক্সাবাজার আঞ্চলিক অর্থনীতিরও এক আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠবে ক্রমাগত। পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ এবং আরাকানিজদের সংগ্রামের বিষয় তো থাকছেই।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটা নব পর্যায়ের শিশুকাল চলছে এখন। এই সুযোগে দেশে অনেক নতুন মিডিয়া হাউসের জন্ম হচ্ছে। এটা লক্ষণ হিসেবে শুভ। দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্যও মিডিয়ার সহায়ক ভূমিকা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের গুণগতভাবে অগ্রসর কিছু করার দিকে মনযোগ দেয়া দরকার।

কক্সবাজার উপকূলে মিডিয়ার জন্য যে বিষয়-বৈচিত্র্য রয়েছে তার সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মেলবন্ধন ঘটলে নিশ্চিতভাবেই বৈশ্বিক মানের অনেক কিছু হতে পারে। নতুন সময় ভাবনা ও কাজের নতুনত্বও চাইছে।

বে-ইনসাইটের জন্য শুভ কামনা।

লেখক- দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক।

টকি হাউজ সিনেমাহল ও কক্সবাজার শহরের বালেগ হওয়া

।। রহমান মুফিজ ।।

একটা খোলা জিপে দাঁড়িয়ে হাইলাইট করা লালচে কালো ঝাঁকড়া চুল উড়িয়ে ছুটে চলেছেন জাফর ইকবাল। চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল। পরনে হাতাকাটা পাতলা কাপড়ের কালো শার্ট। বুকের বোতাম খোলা। কালো সানগ্লাসে চোখ ঢাকা। হাস্যোজ্জ্বল অপূর্ব জ্যোতির্ময় মুখ। প্রথম পলকে চিনতে পারিনি। পরের পলকে চিনতে পারতেই সেই জিপের পেছনে পেছনে দিলাম ছুট। বেশ কিছুক্ষণ ছুটেছিলাম জিপের পেছনে। আমার মতো আরো কয়েকজন হৈ হৈ করে ছুটতে ছুটতে সম্ভাষণ জানাচ্ছে তাকে। তিনিও পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে হাত নেড়ে বাতাসে হাসি ছড়িয়ে দিলেন। আর আমাদের সে কী আনন্দ, সে কী উত্তেজনা, সে কী উন্মাদ হৃদয়ের তোলপাড়! আমাদের প্রিয় নায়ক, আমাদের শহরে এভাবে চুল উড়িয়ে ছুটে চলেছেন! যেন বা ছুটে চলেছেন এক জাদুকর! তার সুঘ্রাণ, তার হাসি, তার চুলের রঙ, তার খোলা জিপের চাকার শব্দ, তার পেছনে আনন্দে লুটোপুটি খাওয়া ধূলো পুরো শহরকে আচ্ছন্ন করে দিয়ে চলে যাচ্ছেন অনন্ত জাদুর দেশে…

নব্বই সালের ডিসেম্বরে, সম্ভবত এরশাদ শাহীর পতন হলো মাত্র। তখনো সবখানে বিজয়ের আনন্দ। গাছের ডালে, ইলেকট্রিকের থামে, উঁচু বাড়ির বেলকনিতে সম্ভবত আসন্ন বিজয় দিবসকে ঘিরে কেউ কেউ পতাকাও উড়াচ্ছিল। যতদূর মনে পড়ে, সেরকম একটা আনন্দ ও উৎসবঘন আবহের মধ্যে একদিন বিকেলে একটা খয়েরি জিপের উপরে চিত্রনায়ক জাফর ইকবালকে দেখে আমি যে অপার্থিব আনন্দের মুহূর্ত আবিষ্কার করেছিলাম, সেটি আমার চোখ থেকে, মগজ থেকে, বুকের কবোষ্ণ কক্ষ থেকে কোনোভাবেই বিস্মৃত হয় না।

সেই যে প্রথম কোনো ফিল্মস্টারকে এমন সামনাসামনি দেখা, সেটা আমার শৈশব-কৈশরের সবচেয়ে উত্তেজনাময় স্মৃতির একটি। আমি যখন সিনেমা সংক্রান্ত কোনো আলাপে প্রবৃত্ত হই, তখনই এই স্মৃতিটাই এমন তড়িৎ গতি নিয়ে হাজির হয় যে, জাফর ইকবালকে দেখার সেই বিরল দৃশ্যটিই আমার সিনেমাভাবনার সদরদরজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

আমার অবচেতনে মগজের মধ্যে অপার আনন্দময় সেই দৃশ্যটি গেঁথে ছিল বলে কি না জানি না, আমি বড় হয়ে হুট করে একদিন ঘর ছেড়ে ঢাকা চলে এসেছিলাম, কেবল সিনেমা বানাবো বলে! হতে পারে, জীবনের খুব ছোট কোনো মুহূর্তও হঠাৎ মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিতে প্ররোচিত করে। আমি সেই ঝুঁকি নিয়েছিলাম। কিন্তু সিনেমা আমার বানানো হয়নি এখনো। সিনেমা বানাতে এসে ঢাকাতেই কেটে গেছে আঠারো-উনিশ বছর। দুনিয়ার সব কাজ করা হয়েছে, সিনেমা আর বানানো হয়নি। কবে যে সিনেমায় হাত দেবো, সে এরাদাও প্রায় ধূসর হতে চলেছে।

কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু স্বপ্ন ধূসর হয় না। সেই নব্বইয়ের দশকের আমার শহর, আমার প্রিয় জলজোছনাময় জন্মভূমি, আমার স্বপ্নতন্তুতে বোনা কক্সবাজার ধূসর হয় না কখনো। ওটা একটা সিনেমার মতো শহর। ওটা আসলে একটা সিনেমার শহর। ওই একটা শহরেই আমি হেমিংওয়ের বুড়ো সান্তিয়াগোকে পেয়ে যাই, আবার পেয়ে যাই মার্কেজের অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বা একশ বছরের নিঃসঙ্গতার বিচিত্র সব চরিত্রকে।

নব্বইয়ের প্রথমার্ধে আমরা যারা নবকিশোর স্বৈরশাসন বা গণতন্ত্রের কিছুই বুঝি না, তবুও মিছিলে ছুটতাম; আমরা যারা নবকিশোর যৌনানন্দের অনুভূতি কেবল অবয়ব পাচ্ছিল, টিভিতে নায়ক নায়িকাকে জড়িয়ে ধরতে দেখলে লজ্জায় লাল হয়ে উঠতাম, শরীর কাঁপতো; আমরা যারা নবকিশোর সারা দিনমান ক্যানভাচারের মজমার ভিড়ে কামরুক কামাখ্যার গল্প শুনে শিউরে উঠতাম, আর বাদশা মিয়া কবিরাজের কাছ থেকে অচেনা বয়জ্যেষ্ঠদের যৌনশক্তি বর্ধক বড়ি কিনতে দেখে বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাস চেপে বিড়বিড় করে বলে উঠতাম, একদিন আমিও বড় হবো!

যদিও আমরা নিজে নিজে বড় হতে পারিনি। আমরা যারা নবকিশোর, অন্য অনেকের মতো আমাদের বালেগ করে তোলার দায়িত্ব স্কন্ধে তুলে নিয়েছিল বাদশা মিয়া কবিরাজের সহকারী, সার্কাসে তাঁবু থেকে পালিয়ে এসে মজমায় খেলা দেখিয়ে বেড়ানো সেই যুবক, নাম যার লাটের পুত কালাইয়া আমাদের কৈশরের আরেক বিস্ময় জাগানিয়া এক্রোবেট। শরীরের খাঁজ থেকে বাজিকরী খেলা আর মুখের ভাঁজ থেকে হাস্যরসের ঝুলি খুলতে খুলতে যে হরণ করে নিতো স্কুল, নাওয়া-খাওয়া, বাড়ি ফেরার জরুরত।

লাটের পুত কালাইয়া ছাড়াও আমাদের বালেগ করে তোলার অনেক অনুসঙ্গ-উপসঙ্গের সঙ্গে একটা রাস্তা আমাদের কৈশরে একদম অনিবার্য নিয়তির মতো আটকে ছিল। তার নাম সিনেমাহল রোড। বড় হতে হতে তার নাম রূপান্তরিত হলো বঙ্গবন্ধু সড়কে। এ এক বিস্ময়কর সড়ক। একমাত্র এই সড়কেই পাওয়া যেতো সেই সময়কার চমক জাগানিয়া আর উত্তেজনাপূর্ণ সব ভিউকার্ড ও পোস্টার। কার ছবি মিলত না সেখানে? দুনিয়ার তাবড় তাবড় তারকারা সেখানে ঝুলে থাকতো, টেবিলে পড়ে থাকতো, তাকের মধ্যে ওঁৎ পেতে থাকতো আমরা পকেটের পয়সা খসিয়ে তাদের কিনে নেব বলে। এই সড়কেই মিলতো রসময়গুপ্ত, গুপ্তবাবুর পরের জেনারেশনের বিপুল সাহিত্য। এই সড়কেই গুরু আজম খান, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, তপন চৌধুরীর নতুন গানের ক্যাসেট, এই সড়কেই পকেটমারের কবলে পড়া, এই সড়কেই ষোড়ষীর হৃদি-প্রেমোদ্যাম নবগণিকার লাস্যভঙ্গির কাছে হার মানা।

এই সড়ক কী ঐশ্বর্যময়, তা জানে কেবল আশির হৃদয়, নব্বইয়ের বুক।

সড়কটির প্রবেশমুখেই লালদীঘি, পাবলিক লাইব্রেরি, কোর্টবিল্ডিং এলাকা। সড়কটির শেষ প্রান্তে টকি হাউজ সিনেমাহল, সড়কটির শেষপ্রান্তে বাঁকখালী নদী। আমাদের এই শহরে, আমাদের বালেগ হওয়ার সময়ে, আমাদের আনন্দ-আনজাম ছিল মূলত এইসব রাস্তা সিনেমাহল রোড, লাল দীঘির পাড়, পাবলিক লাইব্রেরি, কোর্টবিল্ডিং এলাকা, বাঁকখালী নদী, কস্তুরাঘাট, মাঝির ঘাট, লাবনীর চর, ঝিনুক মার্কেট সিবিচের মতো জায়গাগুলো। এখানেই জীবনের প্রথমার্ধের বিপুল বিস্ময় এমনভাবে তড়পাতো যে, এখন ভাবতে গেলেই মনে হয়, ওই দশকে ওই শহরের অলিতে-গলিতে জাদুকরের মতো হাঁটাহাঁটি করতো বিচিত্র সব চরিত্র।

তো, সে জাদুর শহরে সবচেয়ে বড় জাদুর ঘর ছিল টকি হাউজ সিনেমা হল। এই সিনেমা হল মূলত একটা সভ্যতার স্বাক্ষর। একটা শহরের গড়ে ওঠা ও ধ্বংস হওয়ার স্মৃতিবাহী এক নামখ- যেটি আজ নিশ্চিহ্ন বলা চলে। আমরা টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে এখানে সিনেমা দেখতে যেতাম। রাঙ্গা ভাবী, সত্যমিথ্যা, বেদের মেয়ে জোছনা, সুজনসখি, ভেজা চোখ, ডিসকো ডান্সার, টপ রঙবাজ, মরণের পরে, যতদূর মনে পড়ে এই হলে দেখেছিলাম। টকি হাউজ সিনেমা হলে একদম টাটকা ছবি খুব কমই আসতো। মাস দুয়েক বা তারও বেশি পুরনো হয়ে যাওয়া ছবিই বেশি আসতো। প্রায় প্রতি পক্ষেই পর্দায় নতুন ছবি লাগতো। নতুন ছবি আসলেই শহরজুড়ে মাইক নামিয়ে ঘোষণা হতো- হ্যাঁ ভাই… টকি হাউজ সিনেমাহলের রূপালি পর্দায়… চলিতেছে… । ভরাট ও নাটুকে গলায়, এমন ঢলে ঢলে, কায়দা করে, রসিয়ে রসিয়ে সিনেমা ও কলাকুশলীদের নাম বলা হতো যে, সে সিনেমা না দেখলে মানবজীবনই বৃথা। আমরা মাইকের পেছনে ছুটে ছুটে সিনেমার লিফলেট কুঁড়াতাম আর দুষ্টু ছেলেরা দলবেঁধে ঘোষকের কণ্ঠ নকল করে হেসে কুটি কুটি হতাম হ্যাঁ ভাই… চলিতেছে…টকি হাউজ সিনেমা হলের রূপালি পর্দায়…।

টকি হাউজ মূলত আমাদের শহরের একটা উৎসবের নাম। আমার মনে আছে, টকি হাউজের কারণে আমাদের শহরে কখনো রাত নামতো না। আমাদের শহর মানে তো ওই লাল দীঘির পাড়, সিনেমাহল রোড, কস্তুরাঘাট এলাকাটাই। টকি হাউজের কারণেই মূলত এ শহর জেগে থাকতো সবসময়। সারা শহর নিরব ও অন্ধকার, কিন্তু সিনেমাহল রোড থাকতো জমজমাট। নব্বই দশকের শেষ দিকে, ধীরে ধীরে ম্লান হতে শুরু করে টকি হাউজের জৌলুস। নিয়মিত রাত নামতে নামতে অন্ধকার ও নিরব হয়ে আসতে শুরু করে রাস্তাটি। কোত্থেকে কী যেন হয়ে গেল, বাংলাদেশের সিনেমার বাজার এমনভাবে পড়তে শুরু করে যে, সেটাকে আর কেউ টেনে তুলতে পারলো না। আশি-নব্বইয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হতো বছরে গড়ে একশটির মতো। আর তা বর্তমানে এসে ঠেকেছে গড় চল্লিশে। ওই সময় সারাদেশে সিনেমা হল ছিল অন্তত দেড় হাজারের মতো। আর এখন সারাদেশে সিনেমা হল সচল থাকে মাত্র ৬০ থেকে ৭০টি।

সেই ষাটের দশকে নির্মিত হওয়া টকি হাউজ সিনেমা হল, যার জৌলুসে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল কক্সবাজার শহর, সেটি এখন আর নেই। বন্ধ হয়ে আছে প্রায় ২৫ বছর। নব্বই দশকে শহরতলীর ঝিলংজায় নির্মিত হয়েছিল বিডিআর হল (অধুনা বিজিবি হল) এবং বাজারঘাটার দিগন্ত সিনেমা হল। সেই দুটি হলও নাকি বন্ধ হয়ে গেছে, শুনলাম।

আমাদের জাদুর শহরে, সিনেমার মতো এ প্রাচীণ জনপদে আমরা তো দেশখ্যাত সব ফিল্ম স্টারদের শ্যুটিং দেখে দেখে বড় হয়েছি। চলচ্চিত্রের এমন কোনো তারকা ছিল না, হর হপ্তায় যাদের পা পড়তো না এই শহরে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি, ঝাউবাগান, কাটা পাহাড়, কলাতলি, বড়ছড়া ও হিমছড়ির নানা স্পটে জনারণ্যে ভিড় ঠেলে শ্যুটিং দেখার অভিজ্ঞতা তো আমাদের হাজার সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।

নায়করাজ রাজ্জাক, ববিতা, আলমগীর, শাবানা, রোজিনা, চম্পা, সুচরিতা, রুবেল, ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, দিতি, মৌসুমী, সালমান শাহ, শাবনুর, শাবনাজ, শাহনাজ, তামান্না, পপি, অমিত হাসান, আমিন খান, জাহাঙ্গীর, আলেকজান্ডার বো, হুমায়ুন ফরিদি, এটিএম শামসুজ্জামান, রাজীব, জাম্বু, দিলদার, টেলিসামাদ প্রমুখ সিনেমা তারকাদের শ্যুটিং দেখার অভিজ্ঞতা তো আমার একার ঝুলিতেই প্রচুর। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে তাদের ছবিই দেখতে যেতাম টকি হাউজ সিনেমা হলের পর্দায়।

কিন্তু সেই সিনেমার শহরের আজ কী দশা? একটিও সিনেমা হল নেই! অথচ শহরের কী শনৈ শনৈ উন্নতি ঘটেছে। কত কত মেগা প্রজেক্টে ভারি হয়ে উঠেছে তার ভূমি। উন্নয়নের তোপে রীতিমতো গঠন করতে হয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু “পর্যটন শহর” বলে তার যে গালভরা পরিচয়, সে পরিচয়ের প্রতিও কোনো সুবিচার হলো না।

অথচ সমুদ্র-নদী-পাহাড়ের এ শহর পৃথিবীতে ঘোষণা করতে পারতো তার ঐশ^র্যের কথা। সারা পৃথিবীকে আহ্বান করতে পারতো তার কীর্তি দিয়ে, তার চলমানতা দিয়ে। কিন্তু এ শহরকে স্থবির করে রাখা হয়েছে। যে শহরে ‘টকি হাউজ সিনেমা হল’ বন্ধ হয়ে যায় সে শহর স্থবির নয় তো কী? যে শহরে কিশোর-কিশোরীদের বালেগ করে তোলার মতো রাস্তা থাকে না, দোকান থাকে না, প্রতিষ্ঠান থাকে না, পার্ক থাকে না, সে শহরের মানুষেরা বড় হতে পারে, সে আমি বিশ্বাসই করি না। সে শহরের মানুষ স্রেফ শিশুতোষ চৈতন্যের মধ্যে খাবি খায় আর শিশুতোষ জ্ঞানের ক্ষুদ্রতা দিয়েই পৃথিবীকে মাপে। এ তো মধ্যযুগের চেয়েও ভয়ংকর!

কিন্তু কাউকে এই প্রশ্ন করতে দেখলাম না এ শহরকে স্থবির করে রেখে কার লাভ?

এ শহরকে একটা বিশ্বজনীন ও বিশ্বমননের সাংস্কৃতিক নগরীতে পরিণত করার লড়াই আমরা করে গেছি বহুদিন। এখনো সে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। সমুদ্র তীরবর্তী এ জনপদের ইতিহাসের দিকে তাকালে আপনি এর ঐশ্বর্যের কাছে জানু পেতে বসবেন। আপনি এর প্রেমে বুঁদ হয়ে থাকবেন। আপনি যদি একবার এর গৌরবকে অনুভব করতে পারেন তাহলে আপনিই অস্থির হয়ে উঠবেন সে গৌরবকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতে।

একসময় নিয়মিত এ শহরে সার্কাসের দল আসতো। এক সময় কস্তুরাঘাটে ভিড়তো বড় বড় বৈদেশি জাহাজ। পৃথিবীর নামকরা পরিব্রাজকদের পা পড়তো এখানে। সারা পৃথিবীকে উদার বুক নিয়ে আমরা সম্ভাষণ জানাতাম। কিন্তু আমরা এমন কৃপণ হয়ে উঠলাম যে, নিজের শহরেরই সব অলঙ্কার একে একে কেড়ে নিয়েছি।

অথচ এই শহরে গড়ে ওঠার কথা ছিল, বিশ্বমানের ফিল্ম সিটি। এই শহরে থাকার কথা ছিল অন্তত ১০টা থিয়েটার, যেখানে দেশি-বিদেশি সিনেমা প্রদর্শিত হতো। থাকার কথা ছিল বিশ্বমানের আর্ট ইনস্টিটিউট, আর্ট ক্লাব যেখানে দেশিবিদেশি শিক্ষার্থীরা শিক্ষা নিতো, তাদের ছবি ও আর্টওয়ার্ক প্রদর্শিত হতো। সমৃদ্ধ সমুদ্র জাদুঘর, একাধিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নাট্যদল, স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল। লাইব্রেরি থাকার কথা ছিল কয়েকটা। নাইট ক্লাব, সার্কাসের দল থাকার কথা ছিল। নগরকীর্তনের মতো ভ্রাম্যমান অর্কেস্ট্রাদলের ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর কথা ছিল শহরের সর্বত্র। এ শহরে প্রবেশ করলেই মনে হতো, আপনি একটা অনন্ত উৎসবের দেশে চলে এসেছেন। উৎসবের কায়কেওস থেকে কারও দূরে যেতে ইচ্ছে হলেই তিনি আবার ডুব দিতে পারতেন হিমছড়ির পাহাড় বা অজ্ঞমেধা ক্যাংয়ের গাঢ় নিরবতার মধ্যেও।

এ কেবল সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের আকাক্সক্ষা নয়, একইসঙ্গে বিপুল অর্থনৈতিক বন্দোবস্তেরও আকাঙ্ক্ষা। বিশ্বের বুকে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার মতো, বিশ্বকে আহ্বান করার মতো একটা শহর গড়ে তোলার কালেক্টিভ স্বপ্নও বলা চলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, আমরা কেবল সেই স্বপ্নটা দেখে চলেছি। আমাদের আগের প্রজন্ম দেখেছে, এখন আমরা দেখছি, এরপর আমাদের পরের প্রজন্মও একই আকাক্সক্ষা বুকে নিয়ে বড় হবে। কিন্তু কক্সবাজার শহরের উন্নয়নের গুরুদায় যারা স্কন্ধে তুলে নিয়েছেন, তাদের চিন্তায় কী এর সামান্যও নড়াচড়া করে?

করলে তো ভাল, লড়াইটা একসঙ্গে করা যাবে। আর না করলে, একটা টকি হাউজ সিনেমা হলের মর্তবা বোঝাতে হয়তো দ্রুতই আয়োজন করতে হবে একটা গুরুতর পঞ্চায়েত বৈঠক বা একটা জমকালো সেমিনার।
(লেখাটি সংক্ষেপিত)

লেখক-
বাংলা সম্পাদক, নেত্র নিউজ।

সংকুচিত বন, সঙ্কটে হাতি

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালংয়ে ভোরের অন্ধকার তখনও পুরো কাটেনি। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে স্থানীয়দের। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তিনটি বন্য হাতির একটি পাল লোকালয়ে ঢুকে বসতঘরের দেয়াল ভাঙতে শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন বাসিন্দারা।

কিন্তু পালানোর সুযোগ পাননি ছেমন আরা ও তার তিন বছরের মেয়ে আসমা বিবি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাতির সামনে পড়ে ঘটনাস্থলেই মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়। এরপর আম-কাঁঠাল খেয়ে হাতির পালটি পাশের পাহাড়ি বনে ফিরে যায়।

এই ঘটনা নতুন নয়। বরং কক্সবাজারে মানুষ ও হাতির সংঘাত এখন এক গভীর পরিবেশগত সংকটের প্রতীক হয়ে উঠছে, যেখানে একদিকে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মানুষ, অন্যদিকে সংকুচিত আবাসস্থলে আটকে পড়া মহাবিপন্ন এশীয় হাতি।

বন কমছে, বাড়ছে সংঘাত

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগ মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ২০৩টি বন্য হাতি রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২৫টি শাবক। ২০১৬ সালের জাতীয় জরিপে দেশে মোট বন্য হাতির সংখ্যা ধরা হয়েছিল ২৬৮টি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এদের “মহাবিপন্ন” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতির সংখ্যা যতটা না বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি সংকুচিত হয়েছে তাদের বিচরণক্ষেত্র।

কক্সবাজারে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাসিয়াখালী অভয়ারণ্য, ঈদগাঁওয়ের ব্যাঙডেবা বনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবেই প্রায় ১৮ হাজার ৬০০ হেক্টর বনভূমি অবৈধ দখলে চলে গেছে।

দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বনভূমির বড় অংশ এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প, দখল ও বিচ্ছিন্ন বসতিতে আক্রান্ত।

তার ভাষায়, “বনের ভেতরেও মানুষ বসবাস করছে। ফলে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।”

রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের বনভূমির ওপর চাপ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।

বন বিভাগ বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ২০০ একর বনভূমি সম্পূর্ণ উজাড় হয়েছে। আরও কয়েক হাজার একর এলাকায় গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জ্বালানি সংগ্রহ, বসতি নির্মাণ ও অবকাঠামো তৈরির কারণে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র এক মূল্যায়নে বলা হয়, ক্যাম্পসংলগ্ন অন্তত ৭ হাজার ২২০ হেক্টর বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে পুনর্বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার একর এলাকায় নতুন গাছ লাগানো হয়েছে।

তবে বন গবেষকরা বলছেন, একটি প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে গেলে কেবল গাছ লাগিয়ে সেই বাস্তুতন্ত্র দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

হাতির করিডর ভেঙে দিচ্ছে উন্নয়ন

মানুষ-হাতি সংঘাতের আরেকটি বড় কারণ উন্নয়ন প্রকল্প।

কক্সবাজার-দোহাজারী রেললাইন চালুর পর হাতির অন্তত ১৬টি চলাচল পথ ও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে পরিবেশবিদদের অভিযোগ। এছাড়া সড়ক, বসতি, কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্ত অবকাঠামো হাতির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা তৈরি করছে।

ফলে হাতির পাল বাধ্য হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নেকম’-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমানের মতে, হাতি সাধারণত মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক নয়। কিন্তু চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা খাদ্যসংকট তৈরি হলে তারা বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

এক দশকে অন্তত ৬০ হাতির মৃত্যু

মানুষের ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণ হারাচ্ছে হাতিও।

গত এক দশকে কক্সবাজার অঞ্চলে অন্তত ৬০টি হাতি মারা গেছে বলে বন বিভাগ ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা গেছে অন্তত ২৪টি হাতি। গুলিতে আহত বা নিহত হয়েছে আরও কয়েকটি।

২০২০ সালে ঈদগড়ে গুলিতে নিহত হয় পরিচিত একটি স্ত্রী হাতি “গণেশবতী”। ২০২১ সালে রামুতে বিদ্যুতায়িত ফাঁদে মারা যায় একটি শাবক।

বন কর্মকর্তারা বলছেন, ফসল ও ঘরবাড়ি রক্ষায় অনেক সময় স্থানীয়রা অবৈধ বিদ্যুৎ ফাঁদ ব্যবহার করেন। এতে সংঘাত আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নেকম-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমান বলেন, “মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সবসময় ক্ষতিপূরণ পায় না। ফলে কেউ কেউ প্রতিশোধমূলকভাবে বিদ্যুৎ ফাঁদ বা গুলি ব্যবহার করে।”

সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ, কিন্তু প্রশ্ন কার্যকারিতা নিয়ে

বন বিভাগ বলছে, সংঘাত কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • ২০২২-২০২৮ মেয়াদের ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’
  • রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এলপিজি সরবরাহ কর্মসূচি
  • হাতির করিডর পুনরুদ্ধার
  • পুনর্বনায়ন
  • বৈদ্যুতিক ফাঁদ অপসারণ
  • স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা কার্যক্রম

গত তিন বছরে অন্তত ৫২টি বৈদ্যুতিক ফাঁদ অপসারণের তথ্য দিয়েছে বন বিভাগ। এছাড়া কয়েক হাজার হেক্টর এলাকায় বনায়নও করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যার সমাধান ছাড়া সংঘাত কমানো কঠিন।

তাদের মতে, হাতির নিরাপদ চলাচলের করিডর পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

কারণ কক্সবাজারের বন এখন শুধু একটি পরিবেশগত সম্পদ নয়, এটি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের শেষ আশ্রয়গুলোর একটি।

সৈকতের ‘৮২ লাখ টাকার চাকরি’র গল্প: পেওনিয়ার বলছে, সবই ছিল ভুয়া

বিশেষ প্রতিবেদক । বে ইনসাইট

গত ৬ মে হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে কক্সবাজারের তরুণ রাকিবুল ইসলাম সৈকতের একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি। সঙ্গে চমক জাগানো দাবি, বিশ্বখ্যাত আমেরিকান ফিনটেক প্রতিষ্ঠান পেওনিয়ার-এ বছরে ৭০ হাজার মার্কিন ডলারের চাকরি পেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৮২ লাখ টাকা।

খবরটি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ এবং অনলাইন পোর্টালে। দাবির পক্ষে ‘প্রমাণ’ হিসেবে প্রচার করা হয় পেওনিয়ারের লোগোযুক্ত একটি কথিত অফার লেটারও।

কিন্তু গল্পে প্রথম ফাটল ধরে খুব দ্রুতই।

প্রথম সন্দেহের সূত্র

ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘পেওনিয়ার বাংলাদেশ অফিশিয়াল’ নামে প্রায় দেড় লাখ সদস্যের একটি জনপ্রিয় ফেসবুক গ্রুপে সতর্কবার্তা দেন গ্রুপটির অ্যাডমিন রাশেদুল হাসান।

তিনি লিখেন,
“আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেওনিয়ারের নিয়োগ সংক্রান্ত একটি ছবি ছড়িয়ে পড়তে দেখেছি। আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই যে, এই তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং অননুমোদিত। ওই নিয়োগপত্র এবং দাবিকৃত তথ্যগুলো মোটেও আসল নয়।”

এই পোস্টের পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, আসলেই কি সৈকত পেওনিয়ারে চাকরি পেয়েছেন, নাকি পুরো বিষয়টি সাজানো?

সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে নামে ‘বে ইনসাইট’।

খোদ পেওনিয়ার যা জানালো

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে সরাসরি পেওনিয়ার-এর গ্লোবাল পিআর টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে বে ইনসাইট। ইমেইলে জানতে চাওয়া হয়, রাকিবুল ইসলাম সৈকত নামে কোনো বাংলাদেশি তরুণকে প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই চাকরির অফার দিয়েছে কি না।

কয়েকদিন পর পেওনিয়ারের পিআর প্রতিনিধিত্বকারী হিমাংশু গাখার (Himanshu Gakhar) এক জবাবে স্পষ্ট ভাষায় জানান:

“যোগাযোগের জন্য ধন্যবাদ। আমরা পেওনিয়ারের পিআর দেখভাল করছি এবং আপনার অনুসন্ধানের প্রেক্ষিতে জানাচ্ছি, রাকিবুল ইসলাম সৈকত নামে কোনো ব্যক্তি বর্তমানে এই কোম্পানিতে কর্মরত নন। পাশাপাশি, পেওনিয়ার এই ব্যক্তিকে কোনো ধরনের চাকরির প্রস্তাব বা অফিসিয়াল চিঠিও ইস্যু করেনি।”

শুধু তাই নয়, এর আগেই ৮ মে পেওনিয়ারের সিনিয়র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার নাফিউর রহমানও বে ইনসাইটকে বলেন,

“না, এটি সত্য নয়। আমাদের সাইবার সিকিউরিটি টিম ইতোমধ্যেই এই মিথ্যা দাবির পোস্টগুলো সরানোর কাজ শুরু করেছে।”

অর্থাৎ, যে নিয়োগপত্র দেখিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তৈরি করা হয়েছিল, সেটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া।

নীরব সৈকত, বাড়ছে প্রশ্ন

পেওনিয়ারের গ্লোবাল টিম থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর রাকিবুল ইসলাম সৈকতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বে ইনসাইট। তবে অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এরপরই সামনে আসে বড় প্রশ্ন, কেন এমন একটি ভুয়া অফার লেটার তৈরি করা হলো?

এটি কি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টা, নাকি এর পেছনে ছিল আরও বড় কোনো উদ্দেশ্য?

“এ ধরনের ভুয়া পরিচয় ভবিষ্যতে বড় জালিয়াতির পথ খুলে দিতে পারে”

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অপরাধ ও সাইবার আইন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাজমুজ সাকিব বে ইনসাইটকে বলেন,

“যেহেতু পেওনিয়ার নিজেই বিষয়টি অস্বীকার করেছে, তাই এটি স্পষ্টতই প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো আর্থিক ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে এ ধরনের ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে ভবিষ্যতে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ, বিনিয়োগ সংগ্রহ কিংবা ডিজিটাল জালিয়াতির মতো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।”

কেন উদ্বেগ বাড়ছে?

পেওনিয়ার বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সার ও রিমোট কর্মীদের অর্থ লেনদেনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কোনো সরাসরি অফিস না থাকলেও দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে।

প্রযুক্তিখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির চেষ্টা দেশের উদীয়মান ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

শেষ পর্যন্ত যা রইল

কক্সবাজারের তরুণ সৈকতের ‘৮২ লাখ টাকার চাকরি’র গল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তব নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ভুয়া প্রচারণা বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনাটি শুধু একটি ‘ভাইরাল পোস্ট’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ডিজিটাল অর্থনীতি, রিমোট জব এবং ফ্রিল্যান্সিং নির্ভর নতুন প্রজন্মের কর্মবাজারে ভুয়া অফার লেটার কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।

এ কারণেই সাইবার জালিয়াতি রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আরও সক্রিয় নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

৭১০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা চাইলো জাতিসংঘঃ ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হচ্ছে’

বে ইনসাইট । ডেস্ক

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি চাহিদা মেটাতে নতুন করে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ ও তার অংশীদার সংস্থাগুলো।

পাশাপাশি সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের ভেতরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, খুব শিগগিরই মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

বুধবার ঢাকায় জাতিসংঘ ভবনে ২০২৬ সালের হালনাগাদ জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) উপস্থাপনকালে এ আহ্বান জানানো হয়। এই পরিকল্পনার আওতায় কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রিত প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা, সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসছে। এতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাসহ জরুরি সেবাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতে জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে চাপ আরও বেড়েছে।

জেআরপি অনুযায়ী, প্রস্তাবিত তহবিলের মধ্যে খাদ্য সহায়তার জন্য ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, আশ্রয় খাতে ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৬ কোটি ১২ লাখ ডলার, শিক্ষার জন্য ৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার, স্বাস্থ্য খাতে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ডলার এবং জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নে ৩ কোটি ৫১ লাখ ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটে প্রায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ডেপুটি হাই কমিশনার কেলি টি. ক্লেমেন্টস, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রানিয়া দাগাশ-কামারা এবং ইউএন উইমেন-এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা।

কেলি টি. ক্লেমেন্টস বলেন, “সম্পদ সীমিত হয়ে আসার এই সময়ে শরণার্থীদের দক্ষতা ও সহনশীলতা বাড়ানো আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা স্বনির্ভর হতে পারে এবং ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে পারে।”

রানিয়া দাগাশ-কামারা বলেন, “বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অসাধারণ উদারতা দেখিয়েছে। দাতাদের অব্যাহত সহায়তা শরণার্থীদের জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে।”

অন্যদিকে নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা বলেন, “তহবিল সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে ক্যাম্পের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে শুরু করেছে। নারী ও মেয়েরা বাস্তুচ্যুতির ফলে অতিরিক্ত ঝুঁকি ও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।”

জাতিসংঘ জানিয়েছে, বর্তমানে ক্যাম্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার পুরোপুরি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ৪২ শতাংশ পরিবারের আয় অস্থায়ী ও অনিশ্চিত উৎসনির্ভর এবং মাত্র ২৩ শতাংশ পরিবার মানবিক কার্যক্রমের আওতায় নগদ অর্থভিত্তিক কাজে যুক্ত হতে পারছে।

সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের ভেতরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, খুব শিগগিরই মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে এ ধরনের নৌযাত্রা সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। গত মাসে ২৭০ জনের বেশি যাত্রী বহনকারী একটি নৌকা ডুবে গেলে মাত্র ৯ জন জীবিত উদ্ধার হন।

জেআরপি উপস্থাপন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তঃসরকারি সংস্থা বিষয়ক সচিব ও ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মান্যবর এম. ফরহাদুল ইসলাম এবং জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর উপস্থিত ছিলেন। ৫২টি বাংলাদেশি সংস্থাসহ মোট ৯৮টি মানবিক অংশীদার এই পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়েছে।

জাতিসংঘ পুনর্ব্যক্ত করেছে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনুকূলে না আসা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।

সেনা কর্মকর্তা হত্যাঃ ২০ মাসের বিচার প্রক্রিয়া শেষে চারজনের প্রাণদণ্ড, ৯ জনের যাবজ্জীবন

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের বহুল আলোচিত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- মো. হেলাল উদ্দিন, নুরুল আমিন, মো. নাছির উদ্দিন ও মোর্শেদ আলম। তাদের মধ্যে মোর্শেদ আলম পলাতক রয়েছেন। তারা সবাই চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের বাসিন্দা।

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ এক বছর আট মাস ধরে চলা আলোচিত এ মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবীরা। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন।

বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন ও দেশের সেবায় গিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তার পরিবার, সেনাবাহিনী, রাষ্ট্র এবং দেশবাসী-সবারই প্রত্যাশা ছিল ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।”

তিনি বলেন, আদালত কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আলামত, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও মামলার সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সবকিছু পর্যালোচনার পর চারজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

বাদীপক্ষের আরেক আইনজীবী আহসান সেজান বলেন, রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আসামিদের আচরণ ও চেহারায় অপরাধবোধের বহিঃপ্রকাশ ছিল স্পষ্ট।

তিনি বলেন, “লেফটেন্যান্ট তানজিম ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা। মানুষের জানমাল রক্ষা ও আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।”

তিনি জানান, হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলার রায়ই বুধবার ঘোষণা হয়েছে। রায়ে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড, নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৩৯৯ ও ৪০২ ধারায় ১৩ জনকে অতিরিক্ত ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আহসান সেজান বলেন, আদালতের রায়ে তারা “মোটামুটি সন্তুষ্ট”। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে সামাজিক ন্যায়বিচার, জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিচারক উল্লেখ করেছেন, প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপরাধ কেউ যেন সাজাপ্রাপ্ত না হন, সেটিও বিচার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি আরও বলেন, প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আসামিপক্ষের জেরা—উভয় দিক বিবেচনায় নিয়েই আদালত এ রায় দিয়েছেন। খালাস পাওয়া পাঁচজনের বিষয়ে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের অনেক আইনজীবী দাবি করেছেন, তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

মামলার পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামির আইনজীবী তাহসিন সিফাত বলেন, “এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। বিশেষ করে পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামির বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অস্ত্র আইনে পৃথক সাজা দেওয়ায় আমরা মনে করছি, তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।”

২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মইজ্জ্যারপাড়া এলাকায় ডাকাতবিরোধী অভিযানে গিয়ে নিহত হন ২৩ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন।

টাঙ্গাইলের বাসিন্দা তানজিম বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ২০২২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে আর্মি সার্ভিস কোরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার মৃত্যু দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও শোকের জন্ম দেয়।

ঘটনার দুই দিন পর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ হত্যা ও ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। একই ঘটনায় চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়ের করেন।

পরে মামলাগুলোর তদন্তভার দেওয়া হয় চকরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরীর ওপর। তদন্ত শেষে পুলিশ দুই মামলায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। প্রাথমিক এজাহারে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তদন্তে নতুন কয়েকজনের নাম উঠে আসায় তাদের আসামি করা হয়।

‘হাতিটিকে গুলি করা হয় চোখে’

রামু ও চকরিয়ার পাহাড়ি জনপদে যেন শনিবার রাতটা নেমে এসেছিল এক গভীর শোক হয়ে।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের পূর্ণগ্রাম এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে একটি মা হাতি।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রায় এক মাস আগে হাতিটিকে চোখে গুলি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানোর পর শনিবার রাত ১১টার দিকে নিঃশব্দে থেমে যায় তার জীবন।

পূর্ণগ্রামটি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি এলাকা। স্থানীয় লোকজন শনিবার বিকেলে প্রথমে আহত হাতিটিকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। তখনও তার নিঃশ্বাস চলছিল, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট ছিল না। পাশে ঘুরছিল তার তিন বছরের ছোট্ট শাবক। মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বারবার ডাকছিল, সে যেন বুঝতে পারছিল না কেন মা আর উঠছে না।

খবর পেয়ে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ঈদগাঁও রেঞ্জের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

ঈদগাঁও রেঞ্জ কর্মকর্তা উজ্জ্বল হোসেন জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা হাতিটিকে সংকটাপন্ন অবস্থায় পান। দ্রুত চিকিৎসার জন্য ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় তিনি পৌঁছাতে পারেননি। তার পরামর্শ অনুযায়ী বনকর্মীরা ওষুধ প্রয়োগ করেন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। রাত ১১টার দিকে নিভে যায় বনজঙ্গলের এক মায়ের জীবন।

কিন্তু সেই রাতের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি আসে এরপর।

মা হাতিটির মৃত্যুর কিছুক্ষণ পর পাহাড় থেকে নেমে আসে ১০ থেকে ১২টি বুনো হাতির একটি পাল। তারা মৃত হাতিটির চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। শুঁড় উঁচিয়ে ডাকতে থাকে, গর্জন করতে থাকে, যেন নিজেদের ভাষায় শোক জানাচ্ছিল সঙ্গী হারানোর বেদনা। তারপর ধীরে ধীরে আবার ফিরে যায় পাহাড়ের অন্ধকারে।

রোববার হাতিটির মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় রামু থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছে বন বিভাগ।

ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান ময়নাতদন্ত শেষে জানান, হাতিটির বাঁ চোখে প্রায় ১০ ইঞ্চি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে। সেখান থেকে একাধিক সিসার ছররা উদ্ধার করা হয়েছে। তার ভাষায়, স্থানীয়ভাবে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হাতিটিকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়েছিল। চোখের ভেতরে ছররা আটকে থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় ধীরে ধীরে মৃত্যু হয় প্রাণীটির।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ও রামু-ঈদগাঁওয়ের পাহাড়ি বনে একটি আহত হাতি শাবকসহ ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন খবর তারা পাচ্ছিলেন। কিন্তু বহু খোঁজ করেও তখন হাতিটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত মানুষ তাকে খুঁজে পেলেও, বাঁচাতে পারল না।

আর পাহাড়ি অরণ্যে হয়তো আজও কোথাও মাকে খুঁজে ফিরছে সেই ছোট্ট শাবকটি।

হামঃ ‘বাচ্চাটার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না’

আফজারা রিয়া । নুরুল হাসান

শুক্রবার রাত তখন গভীর। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগের হাম ওয়ার্ডে নিভু নিভু আলো। কিন্তু ঘুম নেই কারও চোখে।

এক কোণে ছয় মাসের শিশুকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে বসে আছেন মা ক্রিপাও ম্রো। শিশুটির ছোট্ট শরীর জ্বরে কাঁপছে বারবার। কখনো কাশি, কখনো কান্না আর প্রতিবারই মায়ের মুখে ফুটে উঠছে আতঙ্কের ছাপ।

শিশুটির নাম ইরুই ম্রো। ঠিকমতো চোখও খুলতে পারছে না সে। দুই দিন আগে আলীকদমে শুরু হয়েছিল জ্বর, সর্দি আর কাশি। প্রথমে নেওয়া হয় স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত পাঠানো হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

তিন দিন ধরে ঘুমাননি ক্রিপাও ম্রো। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে তার মনে, “কি হবে?”

কেবল ইরুই নয়, হাম ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটি বেডেই ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য আতঙ্ক আর নির্ঘুম রাতের গল্প।

২০ শয্যার ছোট্ট ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ জন শিশু। জায়গা না থাকায় একটি বেডেই গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে তিন থেকে চারজন রোগীকে। কেউ সন্তানের কপালে ঠান্ডা পানি দিচ্ছেন, কেউ বুকের ওঠানামা দেখে বুঝতে চাইছেন শ্বাস ঠিক আছে কি না। অসুস্থ শিশুদের কান্না আর মায়েদের উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো ওয়ার্ডের পরিবেশ।

কেউ মহেশখালী থেকে, কেউ চকরিয়া, ঈদগাঁও কিংবা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে সন্তানকে কোলে নিয়ে ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। কেউ কান্না চেপে রাখতে পারছেন না। আবার কেউ সন্তানের জ্বর সামান্য কমলেই নীরবে শুকরিয়া আদায় করছেন।

এক সপ্তাহে ভর্তি ১৫৮ শিশু

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগ বলছে, গত এক সপ্তাহে হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১৫৮ শিশু। প্রতিদিন গড়ে ২২ জনের বেশি রোগী আসছে শুধু হাম আক্রান্ত হয়ে।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী,

১০ মে ভর্তি হয় ২৫ জন শিশু, মারা যায় ২ জন
১১ মে ভর্তি হয় ৩০ জন
১২ মে ২৩ জন
১৩ মে ১৮ জন
১৪ মে আবারও ৩০ জন
১৫ মে ১৭ জন
১৬ মে ভর্তি হয় ১৫ জন শিশু

এই ধারাবাহিক প্রবাহই বলে দিচ্ছে, কক্সবাজারে এখনো কমেনি হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা।

ওয়ার্ডের ভেতরে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেক শিশুকে। রাতভর সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে থাকছেন মায়েরা। কেউ বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখছেন, কেউ আবার সারারাত জেগে পানি দিচ্ছেন কপালে।

“বাচ্চাটার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না”

মহেশখালীর গোরকঘাটা থেকে সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন ছেনুয়ারা। চার দিন আগে তার শিশুর শরীরে ধরা পড়ে হাম। এখন কিছুটা জ্বর কমলেও শুরু হয়েছে শ্বাসকষ্ট।

সন্তানকে বুকে জড়িয়ে তিনি বলেন, “হামটা একটু ভালো হয়েছে, কিন্তু এখন শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। বাচ্চাটার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।”

পাশের বেডে বসে ছিলেন ১৭ বছর বয়সী আবেদা। কোলে তার ৯ মাসের শিশু। মাঝে মাঝে সন্তানের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছছিলেন তিনি।

“আমার বাচ্চাটা কিছু খেতে পারছে না। খাওয়ালেই বমি করছে। এখন নাকে নল দিয়ে খাবার দিচ্ছি,” বলেন আবেদা।

আবেদা, ছেনুয়ারা কিংবা ক্রিপাও ম্রো প্রত্যেক মায়ের গল্প যেন একই সুতোয় বাঁধা। সন্তানকে বাঁচিয়ে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার লড়াই।

দুই হাজারের বেশি আক্রান্ত, মৃত্যু ১৭ শিশুর

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষভাগ থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৪১ জন শিশু। এর মধ্যে মারা গেছে ১৭ জন।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা মহেশখালীতে ৪০১ জন। এরপর রয়েছে চকরিয়া ৩১৫ জন এবং রামু ২০৭ জন।

তবে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রামু উপজেলায়। সেখানে মারা গেছে ৭ শিশু। এর মধ্যে ৬ জনের মৃত্যু সন্দেহজনক হিসেবে ধরা হলেও একজনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হামজনিত জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে হাসপাতালের সক্ষমতার ওপরও বাড়ছে চাপ।

ঘুমহীন এক ওয়ার্ডের দীর্ঘ রাত

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে রাত নামে ঠিকই, কিন্তু ঘুম নামে না মায়েদের চোখে।

একদিকে জায়গা সংকট, অন্যদিকে প্রতিদিন বাড়তে থাকা রোগীর চাপ সব মিলিয়ে হাসপাতালজুড়ে তৈরি হয়েছে এক নীরব আতঙ্ক। তবু প্রতিটি মা বুকের ভেতর একটিই আশা নিয়ে সন্তানের পাশে বসে থাকেন, হয়তো সকালে জ্বরটা একটু কমবে। হয়তো শিশুটি আবার চোখ খুলে তাকাবে। হয়তো তাকে সুস্থ করেই ঘরে ফিরতে পারবেন।