বে ইনসাইট ডেস্ক
বে ইনসাইটের জরিপে উঠে এলো কক্সবাজারের সংকট, সম্ভাবনা ও নাগরিক প্রত্যাশার চিত্র।
কক্সবাজারে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে; সেই প্রশ্নে এখনো সন্তুষ্ট নন অধিকাংশ নাগরিক। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, পর্যটন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলার মানুষ। তবে হতাশার মধ্যেও তাঁরা একটি নিরাপদ, পরিকল্পিত ও আন্তর্জাতিক মানের কক্সবাজারের স্বপ্ন দেখেন।
বে ইনসাইট পরিচালিত ‘জনমত জরিপ’-এ উঠে এসেছে এসব তথ্য। কক্সবাজারের মানুষের নিজস্ব মতামত ও অভিজ্ঞতাকে সংখ্যায় রূপ দেওয়ার এ উদ্যোগে অংশগ্রহণকারীদের ৮৬.৫ শতাংশই জেলার স্থায়ী বাসিন্দা। উত্তরদাতাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ২৬ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে এবং বড় অংশই কর্মজীবী ও ব্যবসায়ী। ফলে জরিপের ফলাফলকে স্থানীয় বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উন্নয়ন আছে, কিন্তু ‘অনুভূত উন্নয়ন’ নেই
রেল সংযোগ, মহাসড়ক এবং পর্যটন অবকাঠামোসহ সরকারি মেগা প্রকল্পগুলোর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ৭৮.৬ শতাংশ উত্তরদাতা কিছু না কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেন। এর মধ্যে ৪৯.২ শতাংশ বলেছেন ‘কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন’ এসেছে, আর ২৯.৪ শতাংশের মতে পরিবর্তন ‘স্পষ্টভাবে ইতিবাচক’।
তবে এই পরিসংখ্যানের ভেতরেও রয়েছে এক ধরনের অসন্তোষ। মাত্র তিনজনের একজন দৃশ্যমান উন্নয়নের কথা বলেছেন, অন্যদিকে ৬.৩ শতাংশ মনে করেন এসব প্রকল্প বৈষম্য ও সামাজিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। জরিপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও তার সুফল এখনো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
রোহিঙ্গা সংকট ও নিরাপত্তাহীনতাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা কী; এই প্রশ্নে নাগরিকদের উত্তর ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ৪২.৯ শতাংশ উত্তরদাতা রোহিঙ্গা সংকটকে এবং ২৯.৪ শতাংশ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও অপরাধকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অর্থাৎ মোট ৭২.৩ শতাংশ নাগরিকের কাছে কক্সবাজারের প্রধান সংকট নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত চাপ। পরিবেশ ধ্বংস, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা মাদক ও মানবপাচারের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনমতের বিচারে এগুলো তুলনামূলকভাবে দ্বিতীয় সারির উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে।
বিদেশি পর্যটক না আসার পেছনে একক নয়, বহুমাত্রিক সংকট
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর হওয়া সত্ত্বেও কেন কাঙ্ক্ষিত বিদেশি পর্যটক আসছেন না; এ প্রশ্নে নাগরিকরা কোনো একক কারণকে দায়ী করেননি।
৪৩.৭ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মানের সেবা ও অবকাঠামোর ঘাটতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং দুর্বল আন্তর্জাতিক প্রচারণা, সবগুলো কারণ মিলেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জরিপ বলছে, কক্সবাজারের পর্যটন খাতের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং এটি একটি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার ফল।
পর্যটন নিরাপত্তায় আস্থাহীনতা চরমে
পর্যটকের নিরাপত্তা, হয়রানি নিয়ন্ত্রণ, সৈকত ব্যবস্থাপনা ও রাতের পরিবেশের মূল্যায়নে অত্যন্ত হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে জরিপে।
১ থেকে ৫ স্কেলে ৮৭.৩ শতাংশ উত্তরদাতা পর্যটন নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাকে মাত্র ১ বা ২ নম্বর দিয়েছেন। এর মধ্যে ৫১.৬ শতাংশই দিয়েছেন সর্বনিম্ন স্কোর ‘১’। বিপরীতে সন্তোষজনক মূল্যায়ন (স্কোর ৪ বা ৫) দিয়েছেন মাত্র ১.৬ শতাংশ।
এতে স্পষ্ট হয়েছে, পর্যটননির্ভর অর্থনীতির কেন্দ্র হলেও নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক ক্ষেত্রে নাগরিকদের আস্থা প্রায় তলানিতে পৌঁছেছে।
সম্পদে সমৃদ্ধ, সেবায় বঞ্চিত
শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবার প্রাপ্তি নিয়ে করা প্রশ্নে উঠে এসেছে জরিপের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
৬৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন তাঁরা এসব সুযোগ-সুবিধা খুব সীমিতভাবে পান। অন্যদিকে ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পান’ বলে মত দিয়েছেন মাত্র ১.৬ শতাংশ উত্তরদাতা।
পর্যটন খাত থেকে বিপুল রাজস্ব অর্জন করলেও স্থানীয় মানুষের জীবনে সেই সুবিধার প্রতিফলন খুব কম; এমন ধারণাই জরিপে সবচেয়ে শক্তভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাদের মতে, সম্পদ ও নাগরিক সেবার এই বৈষম্যই কক্সবাজারের অন্যতম মৌলিক সংকট।
২০৩৫ সালের কক্সবাজার: নাগরিকের স্বপ্নের রূপরেখা
সংকটের পাশাপাশি নাগরিকদের স্বপ্নও তুলে ধরেছে এই জরিপ। উত্তরদাতারা আগামী এক দশকে একটি সিন্ডিকেটমুক্ত, দূষণহীন, নিরাপদ ও পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী দেখতে চান।
তাঁদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সবার জন্য সমান বিচার, ৫০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, পর্যটন ও সামুদ্রিক গবেষণাকেন্দ্র, কার্গো বিমানবন্দর, উন্নত রেল যোগাযোগ এবং ২৪ ঘণ্টা পর্যটন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
একই সঙ্গে বাকখালী নদীসহ হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারের দাবিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
কক্সবাজারের আয়নায় কক্সবাজার
বে ইনসাইটের ‘জনমত জরিপ ২০২৬’ মূলত কক্সবাজারের মানুষের নিজের কাছে নিজের জবাবদিহির একটি আয়না। জরিপে উঠে এসেছে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও তার সুফল মানুষের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছেনি; পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় আটকে আছে; আর রাজস্ব আয়ের কেন্দ্র হয়েও স্থানীয় জনগণ কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জরিপ হতাশার নয়, বরং পরিবর্তনের দাবি তুলে ধরা মানুষের কণ্ঠস্বর। নাগরিকেরা সংকট চিহ্নিত করেছেন, একই সঙ্গে সমাধানের পথও দেখিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা কোনো বিলাসী স্বপ্ন নয়; বরং একটি কার্যকর, নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক শহরের জন্য ন্যূনতম দাবি।
বে ইনসাইটের মতে, এই ফলাফল কেবল কিছু পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও পরিকল্পিত উন্নয়নের আহ্বান। আর সেই কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে তুলে ধরাই হবে তাদের গবেষণাভিত্তিক সাংবাদিকতার অন্যতম লক্ষ্য।





























