রোহিঙ্গারা ঘরে ফিরুক- প্রত্যাশা এরদোয়ান পুত্র বিলাল ও বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার মেসুত ওজিলের

প্রতিবেদক, বে ইনসাইট

কক্সবাজার — তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এর ছেলে নেজমেত্তিন বিলাল এরদোয়ান এবং ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান ফুটবল তারকা মেসুত ওজিল বৃহস্পতিবার এক দিনের সরকারি সফরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন।

সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে তারা ঢাকাগামী একটি বিশেষ ফ্লাইটে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। তাদের সঙ্গে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ছিল। বিমানবন্দরে জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান ও পুলিশ সুপার সাইদুর রহমান তাদের স্বাগত জানান।

পরে প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয় পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত তুর্কি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে।

প্রতিনিধিদলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন প্রতিনিধি দলে তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থার সভাপতি আব্দুল্লাহ এরেন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন। এছাড়া বিভিন্ন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরাও সফরে অংশ নেন।

কক্সবাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিলাল এরদোয়ান বলেন, “প্রত্যাবাসন অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই মানুষ তাদের নিজ ঘরে ফিরতে পারুক, যা তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার। আন্তর্জাতিক আইনও শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করে।”

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শিক্ষা সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মৌলিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তিনি জানান, ২০১৭ সাল থেকে টিকা বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, আর তুর্কি দিয়ানেত ফাউন্ডেশন বিশেষভাবে মেয়েদের শিক্ষায় সহায়তা দিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, “আমি আশা করি এ প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে এবং আজকের এই সফর আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, সহায়তা সংস্থা ও দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, যাতে তারা রোহিঙ্গাদের শিক্ষায় আরও জোরালোভাবে সহায়তা করে।”

রমজান উপলক্ষে মেসুত ওজিলের সফর প্রসঙ্গে বিলাল এরদোয়ান বলেন, ওজিল তার রমজানের প্রথম ইফতার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে করতে বেছে নিয়েছেন, যা মুসলিম বিশ্বে একটি শক্ত বার্তা দেবে। “রমজান আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়—সহমর্মিতা, আত্মসমালোচনা ও স্মরণের সময়। আমি আশা করি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রথম ইফতার বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়কে তাদের স্মরণ ও সহায়তায় উদ্বুদ্ধ করবে,” বলেন তিনি।

তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং সরকার ও জনগণের আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

পরে প্রতিনিধিদলটি উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৯-এ টিকা পরিচালিত তুর্কি ফিল্ড হাসপাতাল ও শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পরিদর্শন করে।

এরপর ওজিল রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচে অংশ নেন। ম্যাচ শেষে বিলাল এরদোয়ান, ওজিল ও প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতারে যোগ দেন।

সন্ধ্যায় তারা ঢাকায় ফেরেন।

তিন রাষ্ট্রপর্বে কক্সবাজারের তিন মন্ত্রী: উপকূল থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

পর্যটন নির্ভর জেলা হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসে মন্ত্রিত্বের নজির খুব বেশি নয়। তবে ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ—তিন রাষ্ট্রপর্বেই এই জেলা থেকে মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব ছিল। জন্ম, পরিবার, ছাত্ররাজনীতি, দলীয় উত্থান, মন্ত্রীত্ব এবং বিতর্ক—সব মিলিয়ে তিনজনের রাজনৈতিক জীবন তিন ভিন্ন সময়ের প্রতিচ্ছবি।


ব্রিটিশ ভারত পর্ব

হারবাংয়ের সন্তান, প্রাদেশিক স্বাস্থ্য মন্ত্রী

১৮৯০ সালে কক্সবাজারের হারবাংয়ে জন্ম নেন জালালউদ্দিন আহমদ। শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পান। বাংলা, আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা তাঁকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলে। সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে “খান বাহাদুর” উপাধি দেয়।

১৯৩৭ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বঙ্গীয় আইনসভায় প্রবেশ করেন। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী–এর মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৪৬–৪৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জনস্বাস্থ্য সংকট ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সময়কালেই ছিল তাঁর মন্ত্রীত্ব।
ব্রিটিশ ভারতের শেষ অধ্যায়ে কক্সবাজার থেকে এটিই ছিল প্রথম প্রাদেশিক মন্ত্রীত্ব।


পাকিস্তান পর্ব

রামুর ফরিদ আহমদ: ছাত্রনেতা থেকে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী

৩ জানুয়ারি ১৯২৩ সালে রামুর রশিদ নগরে জন্ম নেন ফরিদ আহমদ। ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারে বেড়ে ওঠা ফরিদ আহমদ উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৫২ সালে তিনি নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪–১৯৬৯ পর্যন্ত নেজামে ইসলাম পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের চিফ হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৭ সালে প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল ইব্রাহিম চুন্দ্রিগারের মন্ত্রিসভায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৫ পর্যন্ত পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৫ সালে বক্সার মুহাম্মদ আলিকে নিয়ে Muhammad Ali Clay শিরোনামে বই লেখেন। মাসিক ‘পৃথিবী’ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক এবং দৈনিক ‘নাজাত’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন।

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের আহ্বানে অনুষ্ঠিত রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। একই বছরে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন। ১৯৭১ সালে দামেস্কে আফ্রো-এশীয় পিপলস সলিডারিটি অর্গানাইজেশনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ ঢাকায় ইস্ট পাকিস্তান সেন্ট্রাল পিস কমিটি গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। ইস্ট পাকিস্তান পিস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি ও রাজাকার বাহিনীর উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এই অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বিতর্কিত করে তোলে।


স্বাধীন বাংলাদেশ পর্ব

সালাহউদ্দিন আহমদ: প্রতিমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৩০ জুন ১৯৬২ সালে চকরিয়ায় জন্ম নেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পিতা শায়দুল হক, মাতা আয়েশা হক। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে তৃতীয় খালেদা জিয়া সরকারের সময়ে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হন।

দলীয় কাঠামোয় তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে দলীয় মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভীর গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়া তাঁকে দলের মুখপাত্র নিয়োগ দেন।

নিখোঁজ ও কারাবাস

২০১৫ সালের মার্চে ঢাকার উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন তিনি। বিএনপির দাবি ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁকে আটক করেছে; প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী র‌্যাবের সদস্যরা তাঁকে তুলে নেয়। দুই মাস পর ভারতের শিলংয়ে তাঁর অবস্থান জানা যায়। ভারতীয় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে বিদেশি আইন ভঙ্গের অভিযোগ আনে। ৩ জুন ২০১৫ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় নর্থ ইস্টার্ন ইন্দিরা গান্ধী রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল সায়েন্সেসে রাখা হয়।

তিন বছরের বেশি সময় পর, ২০১৮ সালের অক্টোবরে মেঘালয়ের আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। ভারতে অবস্থানকালেই বিএনপি তাঁকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ শিলংয়ের আপিল আদালত তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়।

বর্তমান দায়িত্ব

রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন—যা কক্সবাজার থেকে উঠে আসা রাজনীতিকদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্বের পদ।


তিন সময়, তিন বাস্তবতা

রাষ্ট্রপর্বনামজন্মস্থানদলমন্ত্রীত্ব
ব্রিটিশ ভারতজালালউদ্দিন আহমদহারবাংকৃষক প্রজা পার্টিস্বাস্থ্য মন্ত্রী
পাকিস্তানফরিদ আহমদরামুনেজামে ইসলাম পার্টিকেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী
বাংলাদেশসালাহউদ্দ্দিন আহমদচকরিয়াবিএনপিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী; বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার থেকে উঠে আসা এই তিন রাজনীতিক তিন ভিন্ন রাষ্ট্রপর্বে তিন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করেন—ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ অধ্যায়, পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের দলভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি।

সংখ্যায় কম হলেও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের উপস্থিতি তাই স্পষ্ট—সমুদ্রের তীর থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে আমরা সহযোগিতা নিয়েছি-

  1.  ্কালাম আজাদ (২০১৪). মুক্তিসংগ্রামে কক্সবাজার : প্রসঙ্গ রাজনীতি : কক্সবাজার জেলা প্রশাসন পৃ. ১২৭–১২৮.
  2.  Government of Bengal. “Alphabetical list of members”. Bengal Legislative Assembly Proceedings (1939). Vol. 54. 
  3.  Indian Annual Register, Volume 1. Annual Register Office. 1944. p. 2.
  4. হাসান মুরাদ সিদ্দীকী: চকরিয়ার ইতিহাস

আমার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রশাসনের নিরপেক্ষতা: নূর আহমদ আনোয়ারী

  • বে ইনসাইটের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে কক্সবাজারের সংসদীয় আসন গুলোর প্রার্থীদের। এরই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী নূর আহমদ আনোয়ারীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। পাঠকদের জন্য সেই আলাপের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো উপস্থাপন করা হলো:


বে ইনসাইট: আপনাকে স্বাগতম। আপনি দীর্ঘ সময় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তবে সংসদ নির্বাচনে এবারই প্রথম। আপনার মূল প্রতিপক্ষ চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিএনপির হেভিওয়েট নেতা শাহজাহান চৌধুরী। এই লড়াইয়ে আপনি জয়ের ব্যাপারে কতটুকু আশাবাদী?

নূর আহমদ আনোয়ারী: দেখুন, আমি ২০০৩ সাল থেকে একটানা হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছি এবং সংসদ নির্বাচনে লড়ার জন্য এবার পদত্যাগ করেছি। আমি ৩৫ বছর একটি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি এবং ছাত্রজীবন থেকে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। ৫ই আগস্ট পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী এখন আর ছোট কোনো দল নয়; আমরা মাঠ পর্যায়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছি। মানুষ এখন নতুনভাবে চিন্তা করছে এবং পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে। প্রচারণায় সাধারণ মানুষের যে গণজোয়ার ও উচ্ছ্বাস আমি দেখছি, তাতে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ১২ তারিখের নির্বাচনে মানুষ ‘দাড়িপাল্লা’ প্রতীকেই আস্থা রাখবে।

বে ইনসাইট: আপনার জয়ের পথে প্রধান চ্যালেঞ্জ বা বাধাগুলো কী কী বলে মনে করছেন?

নূর আহমদ আনোয়ারী: প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রশাসনের নিরপেক্ষতা। যেহেতু এটি একটি সীমান্ত ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা, তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি; তা না হলে সন্ত্রাসীরা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। এছাড়া এলাকায় প্রচুর কালো টাকার মালিক রয়েছেন যারা নির্বাচনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করতে পারেন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের কর্মী-সমর্থকদের ভূমিকাও একটি বিবেচ্য বিষয় । তবে আমার বিশ্বাস, সাধারণ মানুষ নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন ।

বে ইনসাইট: শাহজাহান চৌধুরী অভিযোগ করেছেন যে আপনারা ভোট কেনার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

নূর আহমদ আনোয়ারী: এটি আসলে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র মতো একটি চেষ্টা। আমি একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছি এবং আমার সম্পদ বিবরণীতে সব পরিষ্কার উল্লেখ আছে; ভোট কেনার মতো কোনো টাকা বা কালো টাকা আমার নেই। বরং শাহজাহান চৌধুরীর পক্ষেই আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী অনেকে কাজ করছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম, খাইরুল আলম চৌধুরী এবং প্যানেল মেয়র এনাম কমিশনারের মতো ব্যক্তিরা উনার পক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে আছেন । আমাদের সাথে কেবল মেহনতি ও সাধারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী আছে যারা কোনো প্রলোভনে নয়, বরং আস্থার কারণে আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন।

বে ইনসাইট: সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির সাথে আপনার সুসম্পর্কের কথা শোনা যায়। এটি নির্বাচনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে?

নূর আহমদ আনোয়ারী: দেখুন, তিনি দীর্ঘদিনের এমপি ছিলেন আর আমি দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ছিলাম। প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজের প্রয়োজনে সরকারি সভাগুলোতে আমাদের একসাথে বসতে হয়েছে, এটি ছিল নিছকই রাজনৈতিক সৌজন্যতা। এর বাইরে উনার সাথে আমার বিশেষ কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই। মজার বিষয় হলো, শাহজাহান চৌধুরীও যখন এমপি ছিলেন, বদির সাথে উনার সুসম্পর্ক আমি দেখেছি। কিছু মানুষ কেবল আমাকে হেয় করার জন্য এই প্রসঙ্গটি তুলে ধরছে।

বে ইনসাইট: আব্দুর রহমান বদির যে ভোট ব্যাংক রয়েছে, সেটি কোন দিকে যাবে বলে আপনি মনে করেন?

নূর আহমদ আনোয়ারী: মানুষ আগে হয়তো বিকল্প না পেয়ে বিভিন্ন দিকে ভোট দিয়েছে, কিন্তু এখন তারা পরিবর্তনের পক্ষে। আমি মানুষের মধ্যে আমার প্রতি যে আকর্ষণ এবং সমর্থন দিন দিন বাড়তে দেখছি, তাতে আমি আশাবাদী যে এই জনস্রোত শেষ পর্যন্ত আমার পক্ষেই আসবে।

বে ইনসাইট: সংখ্যালঘু বা মাইনরিটি ভোটাররা আপনাকে কেন ভোট দেবে?

নূর আহমদ আনোয়ারী: সংখ্যালঘুরা আমাদের কাছে নিজেদের সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে। জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে আমরা মাইনরিটি-মেজরিটির দেয়াল ভেঙে দিতে চাই এবং রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে সমান অধিকার দিতে চাই । ইসলামে অমুসলিমদের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে । তারা এখন বুঝতে পেরেছে যে সংকীর্ণ রাজনীতির চেয়ে ইসলামের আদর্শের কাছেই তারা বেশি নিরাপদ এবং আমাদের প্রতি তাদের আস্থা দিন দিন বাড়ছে ।

বে ইনসাইট: বিএনপি ঘরানার নেতা ও প্রভাবশালী গফুর চেয়ারম্যান আপনার সমর্থনে মাঠে নেমেছেন। এটি আপনার জন্য কতটুকু ইতিবাচক?

নূর আহমদ আনোয়ারী: গফুর চেয়ারম্যান নিজেও একজন অভিজ্ঞ জনপ্রতিনিধি। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে তার নিজের দল বা নেতৃবৃন্দ তার প্রতি অবিচার করেছেন এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছেন । অন্যদিকে সাধারণ মানুষ এখন জামায়াতে ইসলামীর দিকে ঝুঁকছে । জনগণের এই পালস বুঝতে পেরেই তিনি দাড়িপাল্লা প্রতীকের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন । একজন জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধির এই সমর্থন অবশ্যই নির্বাচনী মাঠে আমাদের জন্য বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে ।

বে ইনসাইট: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।

নূর আহমদ আনোয়ারী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

মানুষ ধানের শীষের জন্য পাগল, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব : একান্ত সাক্ষাৎকারে শাহজাহান চৌধুরী

বে ইনসাইটের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে কক্সবাজারের সংসদীয় আসন গুলোর প্রার্থীদের। এরই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। পাঠকদের জন্য সেই আলাপের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো উপস্থাপন করা হলো:


বে ইনসাইট: আপনাকে স্বাগতম। আপনি কক্সবাজারসহ সারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন পরিচিত মুখ এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতা। কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসন থেকে আপনি আগেও সংসদ সদস্য ও হুইপ ছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার আপনার জয়ের প্রত্যাশা কতটুকু?

শাহজাহান চৌধুরী: আল্লাহর মেহেরবানীতে আমি যা দেখছি, সাধারণ মানুষ ধানের শীষের পক্ষে অভাবনীয় সাড়া দিচ্ছে। তারা আমার ওপর গভীর আস্থা রেখেছে। এর আগে আমি চারবার এই এলাকার মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। জাতীয়তাবাদী দলের শাসনামলে এ অঞ্চলে যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, তার নিদর্শন এখনো স্পষ্ট। মানুষ সেই উন্নয়নের কথা মনে রেখেছে এবং আমাদের দলের প্রতি তাদের প্রবল আকর্ষণ রয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে, সবাই ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।

বে ইনসাইট: জয়ের পথে কোনো বিশেষ চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা অনুভব করছেন কি?

শাহজাহান চৌধুরী: প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিপক্ষের মিথ্যা প্রপাগান্ডা। বর্তমানে তারা ভোট কেনার এক নোংরা প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আগে তারা ভোট জোর করে ছিনিয়ে নিত, আর এখন কৌশল বদলে মেহনতি ও গরিব মানুষকে বিকাশ বা নগদ টাকার লোভ দেখিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে। আমি কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সজাগ থাকার অনুরোধ করছি। তবে আমি বিচলিত নই; কারণ সাধারণ মানুষ আমাকে কথা দিয়েছে যে, তারা টাকা নিলেও ভোট ধানের শীষেই দেবে।

বে ইনসাইট: উখিয়া-টেকনাফের জন্য রোহিঙ্গা একটি বিশাল সংকট। আপনি নির্বাচিত হলে এই ইস্যুটিকে কীভাবে মোকাবিলা করবেন?

শাহজাহান চৌধুরী: এটি আমাদের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষ রোহিঙ্গাদের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায় ১৫ লক্ষ রোহিঙ্গা এখানে অবস্থান করছে। আমরা মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু এখন একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। তারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেই তাদেরকে সসম্মানে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করতে হবে। আমি এই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ জোর দেব।

প্রফেসর ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসে হয়তো আবেগপ্রবণ হয়ে কিছু কথা বলেছিলেন, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে কোনো জাদুকরী উপায়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। তবে আমাদের সরকার ক্ষমতায় এলে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি নিয়ে কাজ করব।

বে ইনসাইট: এই অঞ্চলে আব্দুর রহমান বদি এবং আওয়ামী লীগের একটি শক্তিশালী ভোট ব্যাংক আছে বলে প্রচলিত আছে। এবারের নির্বাচনে সেটি আপনার জন্য কতটা প্রভাব ফেলবে?

শাহজাহান চৌধুরী: আওয়ামী লীগের একটি সমর্থক গোষ্ঠী অবশ্যই আছে। তবে তাদের বর্তমান কোনো প্রার্থী না থাকায় সাধারণ কর্মীরাও এখন দেশের স্থিতিশীলতার কথা ভাবছে। আমি মনে করি, অনেক আওয়ামী লীগ কর্মীও এবার ‘আদর্শ নাগরিক’ হিসেবে ধানের শীষে ভোট দেবেন। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে তারা ভোট দেওয়ার জন্য বেশ আগ্রহী। এলাকায় শান্তি বজায় থাকবে এবং কোনো বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা আমি দেখছি না।

বে ইনসাইট: সংখ্যালঘু ভোটারদের পক্ষ থেকে আপনার প্রত্যাশা কী?

শাহজাহান চৌধুরী: সংখ্যালঘু বা মাইনরিটি ভোটারদের নিয়ে আমি অনেক আশাবাদী। তারা আগে হয়তো ভিন্ন মেরুতে ছিল, কিন্তু এখন তারা বিএনপির প্রতি আস্থা রাখছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উখিয়া-টেকনাফের মাইনরিটি ভোটাররা এবার বিএনপির পক্ষেই থাকবেন।

বে ইনসাইট: গফুর চেয়ারম্যানকে নিয়ে কিছু গুজব শোনা যায় যে তিনি আগে বিএনপি করতেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

শাহজাহান চৌধুরী: এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রচারণা। তিনি কোনোদিন বিএনপি করেননি। তার পরিবারের কেউ হয়তো বিএনপি করত, কিন্তু তিনি সবসময় আব্দুর রহমান বদির সাথে থেকে আওয়ামী লীগ করেছেন। বদি তাকে জোর করে চেয়ারম্যান বানিয়েছিলেন। তিনি একসময় আমার সাথে আসার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আমাদের শক্তিশালী স্থানীয় নেতৃত্বের কারণে সুবিধা করতে পারেননি। [৬, ৭]

বে ইনসাইট: সীমান্ত সুরক্ষা, মাদক চোরাচালান এবং টেকনাফ স্থলবন্দর নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

শাহজাহান চৌধুরী: উখিয়া-টেকনাফের দিকে আজ সারা পৃথিবীর নজর। মাদক চোরাচালান আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, আমি এর বিরুদ্ধে একটি ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করব। আমি যখন আগে এমপি ছিলাম, তখন টেকনাফ স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠা করেছিলাম যাতে মানুষ বৈধভাবে ব্যবসা করতে পারে এবং কালোবাজারি বন্ধ হয়। খালেদা জিয়ার সরকারের সময় এই বন্দর থেকে বছরে ১০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসত, যা এখন নানা কারণে থমকে আছে। আমরা ক্ষমতায় এলে তারেক রহমানের নির্দেশনায় এই বন্দরকে আরও আধুনিক ও উন্মুক্ত করব যাতে মানুষ সুন্দরভাবে ও বৈধ উপায়ে ব্যবসা করতে পারে।

বে ইনসাইট: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শাহজাহান চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

দিন ফুরোলো ইউনূসের, ঘরে ফেরা হলো না রোহিঙ্গাদের!

সৌরভ দেব |

কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে যে ঈদের স্বপ্ন দেখেছিল তারা, সেই ঈদ এবারও কাটছে শরণার্থী শিবিরের টিন আর ত্রিপলের ঘরে। সময় শেষ হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের, কিন্তু শেষ হয়নি রোহিঙ্গাদের অপেক্ষা।

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আশার বার্তা দিয়েছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, নোবেলজয়ী পরিচিতি ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে তৈরি হয়েছিল নতুন প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক ছিল তাঁর একটি বক্তব্য ‘সামনের ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ ভূমি মিয়ানমারে গিয়ে করবে।’

কিন্তু সময় গড়িয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। সামনে ঈদও এসে গেছে। আর রোহিঙ্গারা রয়ে গেছে ঠিক সেখানেই—কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা শিবিরে।

‘প্রতিশ্রুতির ঈদ’ অপেক্ষার আরেক বছর

উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে বসবাসরত ৪৫ বছর বয়সী আবদুস সালাম বলেন,“আমরা সত্যিই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল এবার হয়তো সত্যি ফিরব। এখন বুঝি, কথাটা শুধু কথাই ছিল।”

শিবিরে ঈদ মানে উৎসব নয় বরং নতুন করে উপলব্ধি করা আরেকটি বছর হারিয়ে যাওয়ার বেদনা। বাঁশ আর ত্রিপলের ঘরে ঈদের সকালে রান্না হয় সীমিত রেশনের খাবার। নেই আয়োজন, নেই গ্রামে ফেরা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ।

এক রোহিঙ্গা কিশোরীর কণ্ঠে ধরা পড়ে প্রজন্মগত সংকট, “আমি বাংলাদেশেই বড় হয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশ আমার দেশ না, মিয়ানমারও আর চেনে না।”

ইউনূস অধ্যায়ের ইতি, ইস্যু রয়ে গেল

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইউনূস অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। কিন্তু এই সময়টাতেই রোহিঙ্গা সংকট আবারও অগ্রাধিকারের বাইরে চলে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবাধিকারকর্মী কলিম উল্লাহ বলেন, “রোহিঙ্গারা এখন ভূরাজনীতির অনাথ। সবাই সহানুভূতির কথা বলে, কিন্তু দায়িত্ব নিতে চায় না।”

২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আট বছরেও প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখেনি। ইউএনএইচসিআরের হিসাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ হলেও বেসরকারি হিসাবে তা দেড় মিলিয়নের কাছাকাছি।

জাতীয় নীতিমালা নেই, প্রতিনিধিত্ব নেই

‘ইউনাইটেড কাউন্সিল ফর রোহিঙ্গা’র প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ বলেন,“বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত ১৩ লাখ রোহিঙ্গার জন্য কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই। প্রতিনিধিত্বমূলক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, ইউনূসের ওপর তারা আশাবাদী ছিলেন।

‘আমরা মর্যাদা নিয়ে ফিরতে চাই’

রোহিঙ্গা আর্ট ক্লাবের অপারেশন ম্যানেজার ও চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, “আমরা চাই মর্যাদা আর নিরাপত্তা নিয়ে ফিরতে। ইউএন আর বাংলাদেশ সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা যেন আমাদের কমিউনিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।”

ইউনূসের বক্তব্য: আবেগ না কৌশল?

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ছিল আবেগপ্রবণ কোনো মন্তব্য, নাকি কৌশলগত বার্তা—এই প্রশ্ন ঘিরে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন গবেষকরা।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, প্রফেসর ইউনূসের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, প্রথমত, প্রফেসর ইউনূস এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ যে বক্তব্য দিয়েছিলেন—‘আগামী বছর ঈদ আপনারা নিজ ভূমিতে করবেন’—এই কথাটা তিনি আবেগের বশে বলেননি।

তার ভাষায়, “উনি যে অবস্থানে ছিলেন—একটি দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, নোবেল লরিয়েট—এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আবেগে ভেসে এমন বক্তব্য দেওয়ার কথা নয়।”

তিনি মনে করেন, ইউনূসের বক্তব্যের পেছনে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, “একটা সম্ভাবনা হচ্ছে—উনি সত্যিকার অর্থেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান শুরু করতে চেয়েছেন। অন্তত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটা শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছেন।”

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “কিন্তু বাস্তবতা হলো—এটা বাস্তবসম্মত ছিল না।”

সরকারের অবস্থান: ‘এটা প্রত্যাশা ছিল, প্রতিশ্রুতি নয়’

রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যকে প্রতিশ্রুতি নয়, প্রত্যাশার প্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করেছে সরকার।

বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যটি মূলত ঈদকে ঘিরে এই অঞ্চলের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা তুলে ধরার একটি মানবিক ভাষ্য ছিল।

মিজানুর রহমান বলেন, “এই অঞ্চলে ঈদের সময় মানুষ গ্রামে যায়, বাবা-মা ও দাদা-দাদির কবর জিয়ারত করে। রোহিঙ্গারা যেহেতু আট বছর ধরে এখানে আটকে আছে, সেই মানবিক আবেগ থেকেই বলা হয়েছে—আগামী ঈদে আপনারা আপনাদের বাড়িতে যাবেন।”

রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরে কমিশনার বলেন,“এই সমস্যার সমাধান বাংলাদেশের হাতে নেই। এটা মূলত মিয়ানমার রাষ্ট্র এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ এখানে একটি অংশ মাত্র।”
তিনি স্পষ্ট করেন,“যদি সমাধানটা বাংলাদেশের হাতে থাকত, তাহলে গত আট বছর ধরে এই সংকট ঝুলে থাকত না।”

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ: আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইস্যুটি ‘জিইয়ে রাখার চেষ্টা’

অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সীমিত সময়ের মধ্যেও রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আবার দৃশ্যমান করেছে বলে দাবি করেন মিজানুর রহমান।

তার ভাষায়,“আমরা চেষ্টা করেছি। জাতিসংঘে একটি স্পেশাল কনফারেন্স হয়েছে। বাংলাদেশে তিন দিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের নজরে বিষয়টি আনা হয়েছে। বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এসেছেন।”
তিনি বলেন,“ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে আবার এঙ্গেজমেন্ট শুরু হয়েছে—এটা বড় বিষয়।”

কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক ফোরামে অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।

তার মতে, এটি একটি কন্টিনিউয়াস প্রসেস।“ যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে—এই বিশ্বাস আমাদের আছে।”

প্রত্যাবাসন ও তহবিল সংকট— ‘আশা ছাড়ছি না’

বাংলাদেশ কেন রোহিঙ্গা সংকটকে বারবার আন্তর্জাতিক টেবিলে তুলছে, সে ব্যাখ্যাও দেন কমিশনার।
তিনি বলেন, “এর দুটি প্রধান কারণ—একটি হচ্ছে প্রত্যাবাসন, আরেকটি হচ্ছে এখানে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা।”

তিনি জানান, “তহবিল সংকট এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই মানুষগুলোর জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।”

মিজানুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ সরকার এই ইস্যুটি সবসময় আন্তর্জাতিকভাবে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এটা যদি চলমান থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো না কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব—এই আশা আমরা করি।”

রাজনৈতিক দলগুলোর অগ্রাধিকারে রোহিঙ্গা সংকট নেই

নৃ-বিজ্ঞানের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোটি তাদের নির্বাচন ইশতেহারে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরেনি।

তার মতে, এটি রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক।“ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো রোহিঙ্গা সংকটকে একটি বড় জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখছে না। অথচ বাস্তবে এটি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।”

এ বিষয়ে রাজনৈতিক মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন উখিয়া-টেকনাফ সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী।

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন,“প্রফেসর ইউনূস কী উদ্দেশ্যে বা কী পরিকল্পনা নিয়ে এই কথা বলেছিলেন, সেটা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে বাস্তবতা হলো—এত অল্প সময়ে, বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে, এই সংকটের কোনো দৃশ্যমান সমাধান সম্ভব ছিল না।”

তার ভাষায়, “এটা যদি কোনো অলৌকিক ব্যাপার হতো—আলাউদ্দিনের চেরাগ বা আশ্চর্য প্রদীপের মতো—তাহলে হয়তো সম্ভব হতো। বাস্তব দুনিয়ায় সেটা হয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে, উনার সময় শেষ হয়ে গেছে।”
তবে তিনি বলেন, সংকটটি এখানেই শেষ নয়।“যেই সরকারই আসুক, এই বোঝা আমাদের ঘাড়েই থাকবে। এটাকে সিরিয়াসলি হ্যান্ডেল না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।”

‘রাখাইনে বৈধ সরকার নেই’

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী।
তিনি বলেন, “মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক দাঙ্গা, সংঘাত ও সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এখন অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।”

প্রধান উপদেষ্টার আগের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন,“ওই মন্তব্য হয়তো আবেগের জায়গা থেকে ছিল, অথবা তখনকার পরিস্থিতির আলোকে করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলে গেছে।”
তার মতে, সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাখাইনের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। “এখন সেখানে কোনো বৈধ, কার্যকর সরকার নেই। এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন বাস্তবসম্মতভাবে অনিশ্চিত।”

রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি, সরকারের পরিবর্তনে দায় শেষ হয় না

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, “এই চুক্তিটা কোনো বিশেষ সরকার বা দলের মধ্যে হয়নি। এটা হয়েছে দুইটা রাষ্ট্রের মধ্যে।”


তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তখন মিয়ানমারে ছিল সুচির এনএলডি সরকার, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ। কিন্তু সরকার বদলালেই চুক্তি অকার্যকর হয়ে যায়—এমন নয়। রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার চুক্তি করে, আর যে সরকারই আসুক তার দায়িত্ব সেই চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।”
তার মতে, নতুন সরকার চাইলে এই যুক্তি সামনে রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আবার অগ্রাধিকার তালিকায় আনতে পারে।

ইউএনএইচসিআর: ‘পরিস্থিতি এখনো প্রত্যাবাসনের অনুকূল নয়, সমাধান মিয়ানমারেই’

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, বর্তমানে মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী নয়।

ই-মেইলে পাঠানো এক প্রতিক্রিয়ায় সংস্থাটির মুখপাত্র শারি নিজমান জানান, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ধারাবাহিকভাবে জানিয়ে আসছে—উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে তারা নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চায়। তবে সেই প্রত্যাবাসনের জন্য যে মৌলিক শর্তগুলো প্রয়োজন, সেগুলো এখনো পূরণ হয়নি।

ইউএনএইচসিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের নিজেদের আদি এলাকায় বসবাসের সুযোগ, স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার, মৌলিক সেবা ও জীবিকায় প্রবেশাধিকার এবং নাগরিকত্ব ও বৈধ পরিচয়পত্র পাওয়ার একটি স্পষ্ট পথ নিশ্চিত করা জরুরি।

সংস্থাটি বলছে, এই শর্তগুলো নিশ্চিত করা মূলত মিয়ানমারের পূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে—যা বর্তমান বাস্তবতায় অনুপস্থিত।

রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতিকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, সেখানে ব্যাপক সংঘর্ষ, আন্তঃসম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং কাঠামোগত বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। বর্তমানে রাখাইনে বসবাসকারী আনুমানিক ৫ লাখ ৩৬ হাজার রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা, চলাচলের স্বাধীনতা ও নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

ইউএনএইচসিআর বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান মানবিক সংস্থার একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সংস্থাটি জানায়, তারা বাংলাদেশ সরকারকে মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা সেবায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে এবং এমন উদ্যোগের পক্ষে থাকবে, যা রোহিঙ্গাদের স্বনির্ভরতা বাড়াবে ও ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করবে।

নতুন সরকারের সামনে রোহিঙ্গা সংকট আগের মতোই এক কঠিন বাস্তবতা। জাতীয় নীতিমালা, কূটনৈতিক আগ্রাসন ও বহুমুখী সমাধান ছাড়া এই সংকট কাটবে না—এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।

এই মুহূর্তে নিশ্চিত শুধু একটাই—দিন ফুরিয়েছে ইউনূসের, কিন্তু রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার দিন এখনো আসেনি। আরেকটি ঈদ পেরিয়ে যাচ্ছে অপেক্ষার প্রহর গুনে।

উপকূলীয় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার ১১তম দরিদ্র জেলা

বিশ্লেষণ | বে ইনসাইট

উপকূল, লবণ, মৎস্য, পর্যটন ও প্রবাসী আয়ের মতো বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার এখনো দেশের ১১তম দরিদ্র জেলা—এমন বাস্তবতা তুলে ধরে দারিদ্র্য নিরসনে ডাটা-ভিত্তিক পরিকল্পনা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন এলজিইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

গত ২৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের ডিপিএইচই হলরুমে অনুষ্ঠিত ‘কেমন কক্সবাজার চাই’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনজুর সাদেক।

‘উপকূলীয় জেলা হয়েও আমরা পিছিয়ে’

তিনি বলেন, “পৃথিবীর প্রায় সব উপকূলীয় অঞ্চলই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের একমাত্র উপকূলীয় জেলা হয়েও কক্সবাজার অগ্রগতি করতে পারেনি। গ্যাস আছে, সমুদ্র আছে, লবণ-মৎস্য আছে—তবু আমরা পিছিয়ে। প্রশ্ন হলো, অন্যরা পারলো আর আমরা পারলাম না কেন?”

উপজেলাভিত্তিক দারিদ্র্যের চিত্র

মনজুর সাদেক জানান, দারিদ্র্যের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখনো বিপুল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।

তিনি বলেন, “উপজেলা পর্যায়ে এখনো ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে এই হার ৩১–৩২ শতাংশ, রামুতে প্রায় ৩০ শতাংশ।”

এলিট-কেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সমালোচনা

তার মতে, কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে ‘এলিট-কেন্দ্রিক’ চিন্তা প্রাধান্য পেয়েছে।

“আমাদের সামনে আসে এমপি, চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের এলিটরা। কিন্তু যাঁরা সামনে আসেন না, যাঁরা দৃষ্টির বাইরে—দরিদ্র মানুষ—তাঁদের কথা আমরা ভাবিনি। অথচ উন্নয়ন হওয়া উচিত তাঁদের জন্যই,” বলেন তিনি।

আবেগ নয়, দরকার ডাটা-ভিত্তিক চিকিৎসা

দারিদ্র্য নিরসনে আবেগ নয়, ডাটা-ভিত্তিক চিকিৎসা প্রয়োজন উল্লেখ করে মনজুর সাদেক বলেন, “এক্স-রে ছাড়া যেমন চিকিৎসা হয় না, তেমনি ডাটা ছাড়া উন্নয়নও হয় না। ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য নিয়ে জানতে হবে কোথায় হাত দিলে সবচেয়ে বেশি ফল পাওয়া যাবে।”

লবণনির্ভর অর্থনীতি ও কৃষি সংকট

লবণনির্ভর অর্থনীতিকে কক্সবাজারের দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, “অনেক উপজেলায় লবণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে লবণের কারণে অন্যান্য কৃষি উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মানুষ দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

বান্দরবান ও উত্তরাঞ্চলের উদাহরণ

তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য বান্দরবান জেলার উদাহরণ দেখিয়ে বলা যায়—কৃষি ও পশুপালনকে দক্ষতার সঙ্গে গড়ে তুলতে পারলে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

“বান্দরবান একসময় খুব পিছিয়ে ছিল, এখন তারা ১৯তম অবস্থানে। কারণ তারা কৃষি ও গবাদিপশু পালনে দক্ষতা তৈরি করেছে। আমাদের এখানেও সেটা সম্ভব ছিল, কিন্তু আমরা পারিনি,” বলেন মনজুর সাদেক।

প্রবাসী আয় আছে, কিন্তু দক্ষতার অভাব

প্রবাসী আয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কক্সবাজার থেকে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি রেমিট্যান্স আসে।

“কিন্তু আমাদের লোকজন স্কিলড নয়। সৌদি আরব, আবুধাবিতে আমাদের মানুষ আছে—কিন্তু দক্ষতা না থাকায় তারা সম্মানজনক জীবন পায় না। স্কিল ডেভেলপ করলে একই মানুষ আরও ভালো আয় করতে পারত,” বলেন তিনি।

দক্ষতা উন্নয়নে বরাদ্দের প্রস্তাব

সমাধান হিসেবে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

“এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের বরাদ্দের অন্তত ১০ শতাংশ দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় করে এবং ইউনিয়নভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ করা হয়, তাহলে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব,” বলেন মনজুর সাদেক।

ভোকেশনাল শিক্ষার ঘাটতি

হাতে-কলমে কাজ শেখানোর স্কুল ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে এখনো পর্যাপ্ত ভোকেশনাল ও স্কিল স্কুল নেই। অথচ সামান্য ইংরেজি, আচরণগত শিক্ষা ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিলে আন্তর্জাতিক সুযোগ তৈরি হয়।”

‘দারিদ্র্যমুক্ত কক্সবাজার অসম্ভব নয়’

সবশেষে মনজুর সাদেক বলেন, “ঠান্ডা মাথায়, ডাটা নিয়ে, সঠিক জায়গায় হাত দিতে পারলে কক্সবাজারকে দারিদ্র্যমুক্ত করা অসম্ভব নয়। সম্ভাবনা আছে—প্রয়োজন শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন।”

ফান্ড সংকট, পানির যুদ্ধ ও শিক্ষার বিপর্যয়: উখিয়া–টেকনাফে ‘নলেজেবল লিডারশিপ’-এর তাগিদ

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় উখিয়া ও টেকনাফের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি সংকট, শিক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়া, পরিবেশ ধ্বংস ও স্থানীয় অর্থনীতির স্থবিরতা—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘কেমন কক্সবাজার চাই’ শিরোনামের এক নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলেন কোস্ট ফাউন্ডেশন এর সহকারী পরিচালক ও রিজিওনাল টিম লিডার জাহাঙ্গীর আলম। সংলাপটি ২৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের ডিপিএইচই হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়।

উখিয়া–টেকনাফের একজন ভোটার পরিচয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) অনুযায়ী ২০২৫ সালের জন্য রোহিঙ্গা সাড়ার বাজেট ছিল ৯৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ৪৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৪৬ শতাংশ।

তিনি বলেন, “সময় যত যাচ্ছে, ফান্ড তত ড্রাই হয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ বলা হলেও বাস্তবে তা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি। এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা কমে গেলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে—এটা বড় চিন্তার বিষয়।”

‘নলেজেবল লিডার’ না হলে সংকট বোঝা কঠিন

জাহাঙ্গীর আলমের মতে, এই জটিল বাস্তবতা মোকাবিলায় আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব।

তিনি বলেন, “স্ট্যাটিস্টিকস না বুঝলে এই সংকটগুলো বোঝা সম্ভব না। We want knowledgeable leader—এটা এখন সময়ের দাবি।”

ভূগর্ভস্থ পানির ভয়াবহ সংকট

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২২ মিলিয়ন লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, উখিয়া ও টেকনাফে প্রায় ২০ হাজার টিউবওয়েল রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এর মধ্যে ৭ হাজার টিউবওয়েল থেকে পানি ওঠে না।

তার ভাষায়, “একসময় ২০০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যেত। এখন ১ হাজার ফুট গেলেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য এখানে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।”

কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে প্রায় ৪০০ হোটেলে একাধিক ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পানি উত্তোলনেরও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। কিন্তু আমরা নিয়ম না মেনে পানি শেষ করে দিচ্ছি।”

রোহিঙ্গা ইনফ্লাক্সে ভেঙে পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা

রোহিঙ্গা আগমনের পর উখিয়া ও টেকনাফের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তার ভাষায়, “এখানে ভবিষ্যতে আর সচিব কিংবা মন্ত্রিপরিষদ সচিব তৈরি হবে—এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।”

উখিয়ায় ১১টি এবং টেকনাফে ১০টি উচ্চ বিদ্যালয় ও দাখিল মাদ্রাসা থাকলেও সেখানে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের শিক্ষক সংকট তীব্র। অনেক শিক্ষক এনজিওতে চাকরি নেওয়ায় বিদ্যালয়গুলো কার্যত শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছে ৩ হাজার ২০০-এর বেশি লার্নিং সেন্টার এবং ১০ হাজারের বেশি শিক্ষক।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এনজিওগুলো কি আমাদের ২০–২২টি স্কুল ও কলেজে প্যারা টিচার দিতে পারে না? বেতন দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে না?”

পরিবেশ ধ্বংস ও ‘এনভায়রনমেন্ট রিকভারি ফান্ড’-এর দাবি

রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের ফলে উখিয়া–টেকনাফে প্রায় ৪ হাজার একর জমি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান জাহাঙ্গীর আলম।

তিনি বলেন, “এখন আর এই জমিগুলো আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব না। তাই এনভায়রনমেন্ট রিকভারি ফান্ড গঠন করা ছাড়া বিকল্প নেই।”

তার মতে, সরকার জনপ্রতিনিধি ও এনজিওগুলোকে একসঙ্গে বসে এই তহবিল বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে।

‘২৫ শতাংশ হোস্ট কমিউনিটি বরাদ্দ’ বাস্তবে নেই

রোহিঙ্গা সহায়তায় ২৫ শতাংশ অর্থ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “এটা কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। জনপ্রতিনিধিদের উচিত এনজিওগুলোর কাছে হিসাব চাওয়া—২৫ শতাংশ কোথায় খরচ হচ্ছে?”

অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও ফাঁকা ভবন

উখিয়া ও টেকনাফে এনজিও অফিস ভাড়ার আশায় ২০০টির বেশি ভবন নির্মাণ হলেও বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন খালি পড়ে আছে বলে জানান তিনি।

“অনেকে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। আমরা একটা ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে আছি,” বলেন জাহাঙ্গীর আলম।

স্থানীয় উৎপাদন উপেক্ষিত

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ব্যবহৃত লবণ, শুঁটকি ও লুঙ্গি দেশের অন্য অঞ্চল থেকে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব পণ্য যদি কক্সবাজার থেকেই সরবরাহ করা যেত, তাহলে জেলার অর্থনৈতিক চিত্র অনেকটাই বদলে যেত।

স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নের তাগিদ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৭৮টির মতো ছোট হাসপাতাল থাকার পরিবর্তে উখিয়া হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে শয্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা একদিন চলে যাবে। কিন্তু এই অবকাঠামো আমাদেরই কাজে আসবে।”

সবশেষে তিনি বলেন, “ক্ষণস্থায়ী প্রকল্প নয়, আমাদের দরকার সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট। তা না হলে এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।”

রাজ বিহারী দাশ কে, কেন গেলেন জামায়াতের জনসভায়?

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

কক্সবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে ভোট চাওয়ায় আলোচনায় এসেছেন রাজ বিহারী দাশ। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে বিতর্ক ও সমালোচনা।

রাজ বিহারী দাশ কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর। এক সময় তিনি ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ ও লোকনাথ সেবাশ্রম পরিচালনা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন তিনি।

সোমবার সকালে কক্সবাজার শহরের মুক্তিযোদ্ধা মাঠে অনুষ্ঠিত জামায়াতের ওই জনসভায় বক্তব্য রাখেন রাজ বিহারী দাশ। বক্তব্যে তিনি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। বিশেষ করে কক্সবাজারের সনাতনী সম্প্রদায়ের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে জামায়াতকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, কক্সবাজার সদর আসনের পাশাপাশি জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই জামায়াতে ইসলামের প্রার্থীরা বিজয় অর্জন করবেন। একই সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থীদের প্রতি সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন কামনা করেন।

জনসভায় তার এই উপস্থিতির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে দাবি করেন, রাজ বিহারী দাশ আগে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতা ছিলেন এবং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছেন।

বে ইনসাইট রাজ বিহারী দাশের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উজ্জল করের সঙ্গে যোগাযোগ করে। হোয়াটসঅ্যাপে তিনি বলেন, “রাজ বিহারী আওয়ামী লীগের কোনো পদধারী নেতা নন। তবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তিনি অংশ নিতেন এবং যোগাযোগ ছিল।”

কিন্তু নাম প্রকাশ না করার শর্তে কক্সবাজার পৌর আওয়ামীলীগের এক নেতা একটি কমিটির তালিকা বে ইনসাইটের কাছে পাঠিয়েছেন। তাতে কক্সবাজার পৌরসভা অধীন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিটিতে রাজ বিহারীকে সদস্য হিসেবে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে রাজ বিহারী দাশ নিজে বলেন, “আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। আমি একজন জনপ্রতিনিধি—আপনি ডাকলেও যাবো।”

জামায়াতের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যোগ দিয়েছি নাকি দেবো, এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।”

এদিকে কক্সবাজার জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল জাহেদুল ইসলাম বলেন, “রাজ বিহারী হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাদের দলের ডকুমেন্টেড কেউ নন, তবে আগে থেকেই তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল।”

তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকার দাবি নাকচ করে দেন রাজ বিহারী দাশ। তিনি বলেন, “আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বক্তব্য দিয়েছি। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে নয়। প্রতিনিধি হতে হলে বড় কোনো পদ লাগে, আমি সেটা নই।”

রাজ বিহারী দাশের এই অবস্থান ও জনসভায় বক্তব্য ঘিরে কক্সবাজারের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো আলোচনা চলছে।

মহেশখালী কুতুবদিয়াতে শুধু এমপি হবেন না— হবেন সরকারের মন্ত্রী: ডা. শফিকুর

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

মহেশখালীর লবণ শিল্পকে আধুনিক ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেনন, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হলে শুধু এমপি হবেন না— তিনি হবেন সরকারের মন্ত্রী।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বড় কুলালাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সোমবার অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচনী জনসভা। দুপুর ১২টায় হেলিকপ্টারযোগে সমাবেশে যোগ দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

মহেশখালী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ জনসভায় ১১ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতারাও বক্তব্য রাখেন।

বক্তব্যের শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিপ্লব ও সংগ্রামের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করেন। যারা এ লড়াইয়ে আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি।
তিনি বলেন, “আমি নিজের জন্য নয়—দেশ ও জাতির জন্য, যুব সমাজের প্রত্যাশা পূরণের জন্য, মা-বোনদের নিরাপত্তা এবং শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জন্য আপনাদের কাছে এসেছি।”
বাংলাদেশ কোনো আধিপত্যবাদ মানবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এ দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করেই দাঁড়াবে।”

সার্বভৌমত্ব ও গণভোটের ডাক

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের এক ইঞ্চি জমিও কারও কাছে বন্ধক রাখা হবে না এবং কোনো শক্তির চোখরাঙানিকে পরোয়া করা হবে না।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি একটি ‘গণভোট’-এর আহ্বান জানান। তার ভাষায়,“এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি—স্বাধীনতা, আর ‘না’ মানে গোলামি।”
আগামী ১২ তারিখে পরিবার, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের নিয়ে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে গণজোয়ার তৈরির আহ্বান জানান তিনি।

ফ্যাসিবাদ ও যুব সমাজ

গণভোটের বিপক্ষে যারা অবস্থান নেবে, জনগণ ধরে নেবে তারা আবারও পরিবারতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়—এমন মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
যুব সমাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যুবকরা বেকার ভাতা নয়, তারা চায় মর্যাদা ও ন্যায়বিচার।”তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, অপমানজনক ভাতা নয়—যুবকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে সম্মানজনক কর্মসংস্থান।

সম্ভাবনাময় মহেশখালী কুতুবদিয়া

মহেশখালী ও কুতুবদিয়াকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের চেয়েও ভালো অবস্থানে যেতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশি জনগণের চরিত্রের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “৫ আগস্টের পর চার দিন দেশে সরকার না থাকলেও কোথাও লুটতরাজ হয়নি। উন্নত অনেক দেশেও এমনটা দেখা যায় না।”
তার মতে, সমস্যা জনগণের নয়—সমস্যা ছিল নেতৃত্বে।

দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কার

ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে—যা বার্ষিক বাজেটের প্রায় চার গুণ।
তিনি বলেন, “এই টাকা উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। ইনসাফের ভিত্তিতে সারা দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।”
দীর্ঘদিন অবহেলিত মহেশখালীকে একটি ‘স্মার্ট ইকোনমিক জোন’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১২ তারিখের নির্বাচনের পর ১৩ তারিখ হবে ‘নতুন বাংলাদেশের উদয়’।
তার দাবি, সঠিক নেতৃত্ব পেলে মাত্র পাঁচ বছরেই দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, “আমি বিভক্ত বাংলাদেশ চাই না—আমি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ চাই।”

১১ দলীয় জোটের সম্মিলিত প্রতীক ‘দাড়িপাল্লা’ মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান জামায়াত আমির।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন,“আমি কেবল কোনো দল বা পরিবারের বিজয় চাই না। আমি চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।”

ভোট চুরি রোধে সতর্কতা

বক্তব্যের শেষাংশে ভোট চুরির বিষয়ে জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। বিজয়ের পর আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায়ের পরামর্শ দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।
তিনি বলেন,“যে বিজয়ের পর কোনো দল, পরিবার বা গোষ্ঠী ক্ষমতায় গিয়ে জাতির ওপর তাণ্ডব চালায়—সে ধরনের বিজয় আমি চাই না। এমন বিজয়ের কোনো প্রয়োজন নেই।”

কক্সবাজারে দ্রুত ফুরোচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

কক্সবাজারের প্রায় সব উপজেলাতেই দ্রুত হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এর প্রভাবে জেলায় অদূর ভবিষ্যতে তীব্র পানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংকটের চাপ এতটাই বেড়েছে যে অনেক মানুষ এখন বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন পানীয় জলের জন্য বোতলজাত পানির ওপর নির্ভর করছেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) জানিয়েছে, পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ কক্সবাজার পৌরসভা, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায়। অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও পর্যাপ্ত পুনঃভরাট ব্যবস্থার অভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে।

পৌর এলাকায় বছরে ৬–১৪ ফুট পানি নামছে

ডিপিএইচইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার পৌর এলাকায় প্রতিবছর গড়ে ৬ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। শহরের কলাতলী ও টেকপাড়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এখন ৯০ থেকে ১১০ ফুট গভীরে গিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে, যা এক দশক আগেও ছিল অনেক কম গভীরে।

পৌরসভার ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমানে তীব্র পানি সংকট চলছে। অনেক বাসিন্দাকে দূরবর্তী এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, আবার অনেকেই বাধ্য হয়ে পানি কিনে ব্যবহার করছেন।

এসব এলাকার টিউবওয়েলের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি হওয়ায় তা শুধু গোসল ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে। অন্যদিকে পৌরসভার সরবরাহ করা পানির মান নিয়েও ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরবরাহকৃত পানিতে দুর্গন্ধ থাকে এবং তা পানযোগ্য নয়।

জেলায় ৩০ হাজার নলকূপ, তবু সংকট

ডিপিএইচই সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ চালু রয়েছে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক নলকূপ থেকেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়েছে।

শহরের গোলদিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা সাগর দে বলেন, “১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকেই এখানকার ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এখন বিশুদ্ধ পানি পাওয়া আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

‘৪০০ ফুট গভীরেও মিষ্টি পানি পাইনি’ : একবছরে তিনবার বাসা বদল

টেকপাড়া এলাকার একটি ভবনের মালিক মো. ফরহাদ বলেন,“৪০০ ফুট গভীরে নলকূপ বসিয়েও মিষ্টি পানি পাইনি। বাধ্য হয়ে পৌরসভার পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু সেই পানিতেও দুর্গন্ধ থাকে, এটা পান করার উপযোগী নয়।”

কক্সবাজার শহরে ভাড়াবাসায় থাকা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নেপাল চন্দ্র বলেন, পানির সংকটের কারণেই তাকে গত এক বছরে তিনবার বাসা পরিবর্তন করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে শহরে ভাড়া বাসায় থাকি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে পানির অবস্থা খুব খারাপ। খাবার পানি কিনে খেতে হয়। ব্যবহারের পানিও কোথাও লবণাক্ত হয়ে গেছে, কোথাও আবার আয়রনের সমস্যা।”

উখিয়া–টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চাপ

উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এখানকার ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

ডিপিএইচই কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইবনে মায়াজ প্রামাণিক বলেন,“উখিয়ার রাজাপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখন ১০০ থেকে ১১০ ফুট গভীরে গিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে। এসব এলাকায় প্রতিবছর পানির স্তর ৮ থেকে ১৪ ফুট করে নিচে নামছে।”

কোন উপজেলায় কত গভীরে পানি

মো. ইবনে মায়াজ প্রামাণিক জানান, সদর উপজেলার ঝিলংজা ও ভারুয়াখালীতে ৪০–৬০ ফুট, ঈদগাঁওয়ে ২৫–৪৫ ফুট, রামুতে ২০–২৮ ফুট, চকরিয়ায় ২০–৪০ ফুট, পেকুয়ায় ১২–৪০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যাচ্ছে। এসব এলাকায় প্রতিবছর গড়ে ২ থেকে ৫ ফুট করে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

মায়াজ প্রামাণিক বলেন, কক্সবাজারে এখনো স্থায়ী পর্যবেক্ষণ কূপ না থাকলেও বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত ইএমসিআরপি প্রকল্পের আওতায় উখিয়া ও টেকনাফে ২৮টি মনিটরিং কূপ স্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়া ৩২টি মিনি পাইপ স্কিমে রিয়েল-টাইম ডেটা লগার বসানো হচ্ছে, যা আগামী শুষ্ক মৌসুম থেকে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিসেফের সহায়তায় কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফে ভূগর্ভস্থ পানি পর্যবেক্ষণ প্রকল্পও চলমান রয়েছে।

পৌরসভার পানি ব্যবস্থায় চরম চাপ

কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুবেল বড়ুয়া বলেন, “২০১১–১২ সালে যখন আমাদের নয়টি পাম্প হাউস স্থাপন করা হয়, তখন ১৫০ থেকে ২০০ ফুট গভীরেই পানি পাওয়া যেত। এখন ১২০০ থেকে ১৫০০ ফুট গভীরেও পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”

তিনি বলেন, “যে পানি পাওয়া যাচ্ছে তার মান খুব খারাপ ও দুর্গন্ধযুক্ত। অধিকাংশ ব্যক্তিগত নলকূপ অচল হয়ে পড়ায় পৌরসভার ওপর চাপ অনেক বেড়েছে। আমরা সীমিত সংখ্যক কার্যকর পাম্প দিয়ে দিনে দুবার পানি সরবরাহের চেষ্টা করছি।”

ভরসা বাঁকখালীর সারফেস ওয়াটার প্ল্যান্ট

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টকে প্রধান ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রুবেল বড়ুয়া জানান, প্ল্যান্টটির কমিশনিং কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের শেষ অথবা জানুয়ারির শুরুতে এটি পুরোপুরি চালু হবে।

ডিপিএইচই কক্সবাজারের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনসুর বলেন,“এই প্ল্যান্টটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি শোধন করতে পারবে। চালু হলে এটি একাই পৌরসভার প্রায় ৫৫ শতাংশ পানির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে।”

বিশেষজ্ঞ ব্যাখ্যা: কেন নামছে পানি

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি)-এর সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান মো. জাকারিয়া বলেন, কক্সবাজার একটি জটিল হাইড্রোজিওলজিক্যাল এলাকা।

তিনি বলেন, “এখানে আনকনফাইনড ও কনফাইনড—দুই ধরনের ইকুয়েফার রয়েছে। কনফাইনড ইকুয়েফার থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন করলে পানির প্রবাহ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, ফলে স্তর দ্রুত নিচে নেমে যায়।”

লবণাক্ততা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহেশখালী চ্যানেল ও বাঁকখালী নদীর পানিতে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। নদীপথে যেসব এলাকায় পানি প্রবাহিত হয়, সেখানে ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণাক্ততার প্রভাব পড়ছে।

বাড়ছে বাণিজ্যিক পানি বাজার

ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের সুযোগে কক্সবাজারে গত কয়েক বছরে বাণিজ্যিকভাবে পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। জেলায় বর্তমানে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান পরিশোধিত পানি বিক্রি করছে, যার মধ্যে কক্সবাজার শহরেই রয়েছে প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠান।

২০০২ সাল থেকে পানি বিক্রি করে আসা হিমছড়ি ড্রিংকিং ওয়াটারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার কামাল যিসান বলেন, “২০১৭ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর থেকেই পানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। সব মিলিয়ে কক্সবাজার শহরে দৈনিক এক লাখ লিটারের বেশি পানি এখন বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হচ্ছে।”