চৈত্রের স্বস্তি, বৈশাখের আগুন: শুক্রবার পর্যন্ত মেঘ-বৃষ্টি, এরপরই বাড়বে তাপমাত্রা

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

চৈত্রের শেষভাগ। কক্সবাজারের আকাশে কখনো মেঘ, কখনো রোদ। প্রকৃতি যেন নিজের রঙ বদলে নিচ্ছে বারবার। বাতাসে হালকা ঝাপটা, মাঝে মাঝে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি, সব মিলিয়ে এক ধরনের স্বস্তির আবহ।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলছেন, শুক্রবার পর্যন্ত এই পরিবর্তনশীল আবহাওয়া অব্যাহত থাকবে। ঝড়ো হাওয়া, হালকা বৃষ্টি আর সহনীয় তাপমাত্রা, সব মিলিয়ে প্রকৃতি থাকবে কিছুটা ভারসাম্যে।

তবে এই স্বস্তি স্থায়ী নয়।

শনিবার থেকে বদলাবে আবহাওয়া
মেঘ কাটলেই বাড়বে গরমের তীব্রতা

শনিবারের পর থেকেই বদলাতে শুরু করতে পারে আবহাওয়ার চিত্র। ধীরে ধীরে মেঘ সরবে, রোদ পুড়বে আরও তীব্র হয়ে। বৃষ্টি কমে গেলে, আর আকাশ পরিষ্কার থাকলে বায়ুমণ্ডল জমতে শুরু করবে উত্তাপে।

মাসের শেষ দিকে তাপমাত্রা ছুঁতে পারে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত এই তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করতে পারে।

এপ্রিলের শেষে তাপদাহের শঙ্কা
টানা গরমেই তৈরি হতে পারে ‘মৃদু তাপপ্রবাহ’

এই তাপমাত্রা শুধু সংখ্যা নয়, এ এক সতর্কবার্তা।

কারণ, টানা কয়েকদিন যদি তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭.৯ ডিগ্রির মধ্যে থাকে, তখন সেটিকে বলা হয় মৃদু তাপদাহ। আর সেই তাপদাহই এপ্রিলের শেষ দিকে কক্সবাজারে হানা দিতে পারে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আবহাওয়াবিদরা।

গরমে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি
পানিশূন্যতা থেকে হিট স্ট্রোক, সতর্ক না হলেই বিপদ

প্রকৃতির এই উষ্ণতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে শরীরের ঝুঁকিও।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শাহজাহান নাজিরের ভাষায়, অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে ঝরে পড়ে ঘাম, আর সেই সঙ্গে কমে যায় পানির ভারসাম্য। তৈরি হয় পানিশূন্যতা। মাথা ঘোরা, দুর্বলতা আর ক্লান্তি তখন সঙ্গী হয়ে ওঠে।

অনেক সময় দেখা দেয় হিট এক্সহসশন অস্বস্তি, মনোযোগের ঘাটতি, অকারণ অবসাদ। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হিট স্ট্রোক পর্যন্ত গড়াতে পারে, যা হতে পারে প্রাণঘাতী।

ঝুঁকিতে শিশু, বয়স্ক ও শ্রমজীবীরা
রোদে দীর্ঘক্ষণ থাকলেই বাড়ছে শারীরিক ঝুঁকি

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু আর বয়স্করা। তাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাই গরমের আঘাতও লাগে দ্রুত।

শ্রমজীবী মানুষ, যারা রোদে পুড়ে দিন কাটান, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। দীর্ঘক্ষণ সূর্যের তাপে থাকলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন কমে যেতে পারে, বাড়তে পারে অসুস্থতার আশঙ্কা।

গরমে স্বস্তির উপায়
পানি, পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসেই মিলতে পারে সুরক্ষা

তবে এই গরমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথও আছে, সহজ কিছু অভ্যাসেই মিলতে পারে স্বস্তি।

পিপাসা না পেলেও নিয়মিত পানি পান করা জরুরি। প্রতিদিন অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার। ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ফলের রস শরীরকে রাখে সতেজ। চা, কফি বা অ্যালকোহল এড়িয়ে চলাই ভালো।

হালকা রঙের, ঢিলেঢালা সুতির কাপড় শরীরকে দেয় আরাম। বাইরে বের হলে ছাতা, সানগ্লাস, টুপি ব্যবহার করা উচিত।

খাবারের ক্ষেত্রেও হালকা ও সহজপাচ্য খাবার শাকসবজি, ফলমূল, দই—এসবই গরমে শরীরের জন্য উপকারী।

ঘরেও চাই একটু শীতলতা
ছোট অভ্যাসেই মিলতে পারে বড় স্বস্তি

দিনের বেলা পর্দা টেনে রাখলে সরাসরি রোদ ঢোকে না। রাতে আবহাওয়া ঠান্ডা হলে জানালা খুলে দিলে ঘর হয় স্বস্তিদায়ক।

ভিজে গামছা দিয়ে মুখ বা মাথা মুছলে পাওয়া যায় মুহূর্তের প্রশান্তি।

প্রকৃতি এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে, স্বস্তি আর তাপের মাঝামাঝি।
এই সময়টুকু যেন এক নীরব বার্তা দেয়, এখনই প্রস্তুত হও, কারণ সামনে আসছে গরমের দীর্ঘ পথ।

হাতে তেলের মজুদ, রাস্তায় দীর্ঘ লাইন: সংকটটা কোথায়?

বে ইনসাইট | ঢাকা

তপ্ত দুপুর। মাথার ওপর চৈত্রের রোদ, পিচঢালা সড়ক থেকে উঠছে গরম হাওয়া।
রাজধানীর আসাদগেটে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাফওয়ান। পড়াশোনার খরচ জোগাতে অবসরে রাইড শেয়ারিং করেন। কিন্তু আজ তার সময় যাচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে।

দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তার সামনে গাড়ির লাইন, পেছনেও একই চিত্র। এই লাইন আসাদগেট থেকে বিজয় সরণি, দুই কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব পেরিয়ে গেছে।

সাফওয়ান বে ইনসাইটকে বলেন, “পাম্পগুলো আগের বছরের পারফরম্যান্স অনুযায়ী তেল পাচ্ছে। অনেক পাম্পেই কম পড়ে যাচ্ছে। এজন্যই মনে হয় এমন লাইন।”

তথ্য বলছে, আমদানি করা ডিজেলের চাহিদা বাংলাদেশে বেশি থাকলেও, দীর্ঘ সারির অধিকাংশ বাইক বা গাড়িই দাঁড়িয়ে আছে অকটেন বা পেট্রোলের জন্য। অথচ দেশেই এই চাহিদার একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয়।

একারণেই প্রশ্নটা থেকে যায়, সংকট কি সত্যিই তেলের?

উৎপাদন আছে, তবুও অস্থিরতা

পরিসংখ্যান বলছে, গল্পটা এত সরল নয়। বাংলাদেশে বছরে পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টন, অকটেনের চাহিদা ৪ লাখ ১৫ হাজার টন।

দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে এর একটি বড় অংশই উৎপাদন হচ্ছে দেশে।
পেট্রোলের প্রায় অর্ধেক, অকটেনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

শুধু সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্টেই গত অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার টনের বেশি পেট্রোল আর ৫৫ হাজার টনের বেশি অকটেন।

অর্থাৎ চাকা থামিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ঘাটতির গল্প এখানে নেই।

তবুও শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে শত শত যানবাহন। যেন জ্বালানি নয়, ‘অপেক্ষা’ই এখন প্রধান জ্বালানী।

সংকটের নতুন নাম: আতঙ্ক

বাস্তবতা বলছে, এটি জ্বালানির ঘাটতির চেয়ে বেশি মানসিক সংকট।

গুজব, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের ভয় এই তিনে মিলে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য চাপ।

পাম্প মালিকদের ভাষায়, মানুষ এখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিচ্ছেন। অনেকে মজুত করছেন, “যদি পরে না পাওয়া যায়” এই আশঙ্কায়।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বে ইনসাইটকে বলেন,

“মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা গুজব ছড়াচ্ছে, মিডিয়াও কিছুটা ভূমিকা রাখছে।”

অর্থাৎ পাম্পে যতটা তেল কমছে, তার চেয়ে বেশি কমছে মানুষের আস্থা।

পাম্পগুলো তেল মজুত করছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “তেল ডিপো থেকে শুধু পাম্পেই আসে না, নানা দপ্তরে যায়, কলকারখানায় যায়, সরকারি অফিসে যায়। সেখান থেকে তেল মজুদ হতে পারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, আমাদের তেল বিক্রি না করে মজুত করার প্রশ্নই আসে না।”

মজুত আছে, তবুও পৌঁছাচ্ছে না

সরকারি হিসাব বলছে, দেশে জ্বালানির মজুত স্বাভাবিক।

জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দেয়া তথ্যমতে বর্তমানে রয়েছে-

  • প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টন ডিজেল
  • ১৬ হাজার টন পেট্রোল
  • ১০ হাজার ৫০০ টন অকটেন

এপ্রিল মাসে আরও আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে চলছে অভিযান। মার্চ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত ৩৪২টি অভিযানে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ লিটার জ্বালানি।

কিন্তু এই সংখ্যাগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের কাছে যেন পৌঁছায় না।

কারণ বাস্তবতার আরেকটি দিক আছে, সরবরাহের অসমতা। যেখানে তেল আছে, সেখান থেকে যেখানে প্রয়োজন সেই যাত্রাপথেই তৈরি হচ্ছে ফাঁক।

দাম, লোকসান আর নীতির দ্বিধা

বর্তমানে এক লিটার ডিজেলের সরবরাহ খরচ প্রায় ২০০ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ টাকায়। প্রতিদিন লোকসান প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা।

এই আর্থিক চাপ সরকারের ওপর যেমন আছে, তেমনি এর প্রভাব পড়ছে বাজারের আচরণেও।

সংসদে জ্বালানির দাম প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছিলেন, “গত মাসে সরকার কোনো মূল্যবৃদ্ধি করেনি। তবে আগামী মে মাসের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে কাজ চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবং মন্ত্রিপরিষদের আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে দাম সমন্বয় করা হবে।”

তবে বিষয়টি নিয়ে বে ইনসাইটের সাথে কথা হয় বিশ্লেষক ও এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার এর সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের। তিনি বলেন, “পদ্ধতি তৈরি করে সেভিংস করার জন্য এই মূল্য সমন্বয় দরকার ছিল। কিন্তু দাম সমন্বয় করলে চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে সেটি উল্টো প্রভাবও ফেলতে পারে।”

এর মধ্যেই বিশ্ববাজারে এসেছে নতুন মোড়, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার খবরে তেলের দাম কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বিবিসি তার খবরে বলছে, বিশ্ববাজারে বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলার ৩০ সেন্টে নেমে গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া তেলের দাম প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ কমে ৯৩ ডলার ৮০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ যেখানে দেশে দাম বাড়ানোর চিন্তা, সেখানে বিশ্ববাজারে দাম কমার ইঙ্গিত।

এই দ্বন্দ্বই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় প্রশ্ন।

সমাধান: নিয়ন্ত্রণ, না আস্থা?

বিশৃঙ্খলার এই চিত্রে বিশেষজ্ঞরা খুঁজছেন প্রযুক্তির সমাধান। শ্রীলঙ্কার মতো কিউআর কোডভিত্তিক ব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল নেওয়া যাবে না।

মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের মতে, “ট্রাফিক পুলিশের কাছে স্ক্যানার থাকে, তারা স্ক্যান করে আপনার গাড়িতে কোন প্রবলেম থাকলে ধরে ফেলে। প্রত্যেকটা গাড়িতো ডিজিটাইজড। পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা আছে, তাদের কাছে একটা স্ক্যানিং সিস্টেম চালু করিয়ে দেন।”

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “সংকট পুরোপুরি নেই, কিন্তু যাদের প্রয়োজন, তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। একাধিকবার বেশি তেল নেওয়ার প্রবণতা থাকলে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”

অর্থাৎ সংকট সমাধানে শুধু জ্বালানি নয়, ব্যবস্থাপনাই মূল বিষয়।

বৈশ্বিক চাপের ছায়া

এই সংকট শুধু দেশের ভেতরের নয়। বিশ্ববাজারেও অস্থিরতা চলছে।

ইরান যুদ্ধ, সরবরাহ অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে তেলের বাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা।

বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্য ডিজেল, ক্রুড অয়েল ও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করাই হয়ে উঠতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ।

অপেক্ষার শহর

আমরা যখন এই হিসাব-নিকাশ করছি, আসাদগেটের সেই লাইন তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, কিন্তু অপেক্ষা শেষ হয়নি।

সাফওয়ান এখনও দাঁড়িয়ে, তার বাইকের ট্যাংক প্রায় খালি।

রাজনৈতিক পালাবদলের পর কক্সবাজারে ‘বেপরোয়া’ পাহাড় কাটা!

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর থেকেই কক্সবাজারে হঠাৎ করে পাহাড় কাটার প্রবণতা বেড়েছে।

কক্সবাজারে পাহাড় কাটার ওপর হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা কার্যত অমান্য করে চলছে বিস্তৃত ‘মাটি বাণিজ্য’। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির ফাঁক গলে রাতের অন্ধকারে রামু, পেকুয়া, উখিয়া ও সদর উপজেলায় একের পর এক পাহাড় সমতল করা হচ্ছে, যার মাটি যাচ্ছে ইটভাটা ও নির্মাণ প্রকল্পে।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত এক্সকাভেটর চালিয়ে পাহাড় কাটা হয়, যাতে দিনের বেলায় প্রশাসনের নজরে না পড়ে। এতে শত বছরের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি দ্রুত বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

দীর্ঘদিন পাহাড় রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত পরিবেশকর্মীদের দাবি, প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের অবহেলা এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতায় এই অবৈধ কর্মকাণ্ড নতুন মাত্রা পেয়েছে।

পাহাড় কাটা বিরোধী আন্দোলনের সংগঠক ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, “নির্বাচনের পর হঠাৎ করেই পাহাড় কাটার ঘটনা বেড়ে গেছে। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, অনেক ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ায় এর মূল কারণ। এমনকি এতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে।”

ঈদের ছুটিতে ২০০ ফুট পাহাড় ‘গায়েব’

রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের পূর্ব লামাপাড়ার ঘোনারপাড়া এলাকায় ঈদুল ফিতরের ছুটিতে প্রায় ২০০ ফুট উচ্চতার একটি পাহাড়, যার আয়তন প্রায় ১০ একর, সম্পূর্ণ সমতল করে ফেলা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন রাত ৭টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে মাটি কেটে ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব মাটি গেছে আশপাশের ইটভাটা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে।

একই ইউনিয়ন ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি এলাকায় অন্তত আটটি পাহাড় ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, “ঈদের ছুটিতে কাউয়ারখোপ ও দক্ষিণ মিঠাছড়িতে পাহাড় কাটার মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।”

অভিযানে মিলেছে ৯০ হাজার ঘনফুট মাটি উত্তোলনের প্রমাণ

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) পরিদর্শক মুসাইব ইবনে রহমান জানান, গত ৩০ মার্চ রামুর লামাপাড়া, ঘোনারপাড়া ও স্কুলপাড়া এলাকায় যৌথ অভিযানে পাহাড় কাটার ৮-৯টি স্থান শনাক্ত করা হয়।

“কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৯০ হাজার ঘনফুট মাটি উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

এ সময় একটি এক্সকাভেটর ও একটি ডাম্প ট্রাক জব্দ করা হয় এবং ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

‘হাতেনাতে না ধরলে শাস্তি দেওয়া যায় না’

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, অভিযান অব্যাহত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।

ফজলে রাব্বি চৌধুরীর মতে, “মোবাইল কোর্ট আইনে হাতেনাতে না ধরলে শাস্তি দেওয়া যায় না, এ সুযোগটাই নিচ্ছে অপরাধীরা।”

আইনি নোটিশ, কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না নির্দেশনা

গত ১০ মার্চ বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলা) ১২ জন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠায়। এতে ২০১২ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় পাহাড় কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।

আইন অনুযায়ী, ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও পাহাড় কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। যার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

‘ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি’ দেখিয়ে দায় এড়ানোর অভিযোগ

পেকুয়ার টইটং ইউনিয়নের “আসমানের খুঁটি” নামে পরিচিত পাহাড়টির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিন-রাত এক্সকাভেটর চালিয়ে ২.৫ একর আয়তনের পাহাড়টি সমতল করা হয়েছে।

বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, “এটি সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই বন বিভাগের সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”

তবে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে উখিয়ার থোয়াইংকাটা, সদরকাটা এবং রাজাপালং এলাকাতেও, যেখানে পাহাড় কিনে বা দখল নিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ কেমিস্ট আব্দুস সালাম বলেন, কোনো পাহাড় সরকারি বা ব্যক্তিগত হোক, তা কাটা যাবে না। তিনি জানান, টইটং ও শিলখালীতে পাহাড় কাটার ঘটনায় পৃথক মামলা দায়েরের জন্য চট্টগ্রামের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অবৈধ ভাবে পাহাড় কাটলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

‘প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় বাড়ছে ধ্বংস’

পরিবেশকর্মীরা বলছেন, পাহাড় কাটার পেছনে মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে মাটি বাণিজ্য। আর প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও নিষ্ক্রিয়তাই এ ধ্বংসযজ্ঞকে উৎসাহ দিচ্ছে।

পরিবেশকর্মী দীপক শর্মা দীপু বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে কক্সবাজারের পাহাড় একসময় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি এবং কৃষিজমির ক্ষতি হবে।”

তিনি পাহাড় ও বন রক্ষায় বন বিভাগের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন।

বর্ষা সামনে, ঝুঁকি বাড়ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়বে। প্রতিবছর চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় ধসে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

এ অবস্থায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজারের স্থানীয়দের জন্য নেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো, ৮ বছরে রোহিঙ্গা চিকিৎসা নিয়েছে আড়াই লাখ

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে বে ইনসাইট কাজ করতে গিয়ে- কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং এবং ৪৩ হাজারের বেশি রোগী মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। এটি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সংস্থা এমএসএফ এর তথ্য। যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করেন।

স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি এবং দীর্ঘদিন শিবিরজীবনের মানসিক চাপের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিন্তু এই অগ্রগতির বিপরীতে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারিভাবে কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, যা উদ্বেগজনক বাস্তবতা হিসেবে উঠে এসেছে।

বছরের শুরুতেই সেবার চাহিদা স্পষ্ট

চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এই দুই মাসেই শরণার্থী শিবিরে ৭,৬১৬ জন ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং গ্রহণ করেছেন ও ৩,৫৯৩ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েছেন।

সেবাটি রোহিঙ্গা ও স্থানীয় উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত থাকলেও, সিংহভাগ রোগীই রোহিঙ্গা।

একজন মাঠপর্যায়ের কাউন্সেলর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,

“প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। অনেকেই প্রথমে শারীরিক সমস্যা মনে করে আসে, পরে বোঝা যায় বিষয়টা মানসিক।”

ট্রমার দীর্ঘ ছায়া

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সহিংসতা ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ এখনও সেই ট্রমার ভার বহন করছে। শিবিরের অনিশ্চিত জীবন, কর্মসংস্থানের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা, সব মিলিয়ে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

কুতুপালং শিবিরের বাসিন্দা (ছদ্মনাম) রহিমা বেগম বলেন,

“রাতে ঘুম হয় না। পুরনো কথা মনে পড়ে। বাচ্চাদের নিয়ে সবসময় ভয় লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয় মাথা ঠিক থাকে না।”

স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, এমন অভিজ্ঞতা এখন ব্যতিক্রম নয়, বরং ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যে মানসিক সমস্যাগুলো

চিকিৎসকদের মতে, শিবিরে প্রধান সমস্যা হলো: বিষণ্নতা (Depression), উদ্বেগজনিত ব্যাধি (Anxiety disorder), সাইকোসিস (Psychosis), বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার (Bipolar Mood disorder)।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কার্যকর চিকিৎসার জন্য শুধু ওষুধ নয়, নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মনোসামাজিক সহায়তাও প্রয়োজন।

এমএসএফ-এর সমন্বিত চিকিৎসা মডেল

এমএসএফ-এর ডেপুটি কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (মেডিকেল) ডা. আশিষ কুমার দাশ বলেন,“কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ওষুধ ও কাঠামোবদ্ধ কাউন্সেলিং, এই দুইয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। আমরা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিটগুলোতে এই দুই ধরনের চিকিৎসাই একসাথে প্রদান করি।”

এমএসএফ ইউনিটগুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং কাউন্সেলর কাজ করছেন, যা রোগীদের প্রমাণভিত্তিক ও সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করছে।

স্থানীয়দের জন্য সেবা সীমিত

কিন্তু কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো এখনও সীমিত। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মং টিন ঞ বলেন, “বর্তমানে হাসপাতালে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই এবং আলাদা মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগও চালু হয়নি।

তিনি বলেন, খুব শিগগিরই আমরা একটি আলাদা বিভাগ চালুর পরিকল্পনা করছি। যেখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সেলর থাকবে।”

স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন,

“মানসিক সমস্যা হলে কোথায় যাবো, সেটা আমরা জানিই না। সরকারি হাসপাতালে এই সেবা থাকলে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হতো।”

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

রোহিঙ্গা শিবিরে সেবার অগ্রগতি ইতিবাচক হলেও, অনেক মানুষ এখনও চিকিৎসার বাইরে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সেবা না থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে কক্সবাজারের এই চিত্র একটি বিষয় স্পষ্ট করে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখন মানবিক সহায়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য।

টেকনাফ স্থলবন্দর চালুঃ বাস্তবতা ও নিরাপত্তা কতোটুকু?

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর টেকনাফ স্থলবন্দর পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। তবে সরকারি এই সিদ্ধান্তের পরও নিরাপত্তা, নৌপথ ও বাস্তব বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়ে গেছে নানা সংশয় ও ভিন্নমত।

সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে টেকনাফ স্থলবন্দর পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আজ থেকে বন্দরের কার্যক্রম পুনরায় সচল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

তিনি জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কার্যক্রম চালানো হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা ঠেকাতে কড়াকড়ি আরোপের কথাও জানান তিনি।

নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভিন্ন চিত্র

তবে মন্ত্রীর এই ঘোষণার পরও বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি এতটা সরল নয়।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক আবেদ আহসান সাগর বে ইনসাইটকে বলেন, “আমাদের মনে হয়েছে বন্দরের কার্যক্রম চালু না হওয়ার পেছনে মূল ফ্যাক্টর ছিল নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আপত্তি, বিশেষ করে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের অবস্থান ছিল নেগেটিভ।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে, বন্দর ব্যবহার করে চোরাচালান বৃদ্ধি, বিশেষ কিছু পণ্যের (যেমন সিমেন্ট ও রড) সম্ভাব্য অপব্যবহার, এবং সীমান্ত পরিস্থিতির ঝুঁকি।

এছাড়া বন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা পোস্ট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে ব্যবসায়ীরা এর বিরোধিতা করেছেন, কারণ বন্দরের নিজস্ব আইনগত কাঠামো রয়েছে।

স্ক্যানার বসানোর প্রস্তাব

বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আসে পণ্য তদারকির জন্য স্ক্যানার স্থাপন নিয়ে।

সাগর বলেন, “মন্ত্রী বলেছেন বন্দরে স্ক্যানার বসানো হবে। এতে পণ্য ওঠানামার সময় স্ক্যানের মাধ্যমে যাচাই করা যাবে। বিজিবি চাইলে গেট বা চেকপোস্টে তল্লাশি করতে পারবে।”

‘চালু’ ঘোষণা, কিন্তু পণ্য আসেনি

টেকনাফ স্থলবন্দরের মহাব্যবস্থাপক জসীম উদ্দিন জানান, বাস্তবে এখনও বাণিজ্য শুরু হয়নি।

তিনি বলেন, “বন্দর তো খোলা ছিলই। এখনো আমরা প্রস্তুত আছি। মালপত্র আসলে কার্যক্রম শুরু হবে, তারপরই বোঝা যাবে পরিস্থিতি।”

আরাকান আর্মি ও নৌপথের জটিলতা

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে আরাকান আর্মি নাফ নদীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে পণ্যবাহী ট্রলার আটকে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু বন্দর চালুর ঘোষণা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

আবেদ আহসান সাগর বলেন, “বর্তমান নৌপথে চলাচল করতে গিয়ে অনেক সময় মিয়ানমারের জলসীমা ব্যবহার করতে হয়। এই কারণে বিভিন্ন গ্রুপকে টাকা দিতে হচ্ছে। নাফ নদের নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় ড্রেজিং করা গেলে বিকল্প পথ তৈরি হবে, তখন এই ঝুঁকি কমবে।”

তার মতে, ড্রেজিং না হলে কিছুদিন পর আবারও বন্দর অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আটকে

ব্যবসায়ীদের দাবি, মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিপুল অর্থ আটকে আছে।

সাগর বলেন, “প্রায় ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ড্রাফট আকারে আটকে আছে। পণ্য আসতে পারলেই এই অর্থ সমন্বয় করা সম্ভব হবে।”

ব্যবসায়ীদের আশাবাদ, তবে শর্তসাপেক্ষ

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বন্দর চালুর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, “এটা ব্যবসায়ীদের জন্য অবশ্যই ভালো। পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ নিত্যপণ্য কম খরচে আসতে পারবে। রাজস্বও বাড়বে।”

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, “আমরা আরাকান আর্মিকে বুঝি না, আমরা বুঝি ওপারের ব্যবসায়ীদের। তারা কীভাবে মাল পাঠাবে, সেটা তাদের দায়িত্ব।”

নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান

এদিকে টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মুহাম্মদ হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, “মন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা সেটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছি। নিরাপত্তা বিষয়টি আলোচনা হয়েছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

বন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা কাঠামো জোরদারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর ২৭ একর জমির ওপর টেকনাফ স্থলবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।

তবে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল একটি কাঠবোঝাই ট্রলার আসার পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় আমদানি কার্যক্রম।

সরকারি ঘোষণায় বন্দর চালুর পথ খুললেও, বাস্তবে বাণিজ্য কতটা দ্রুত স্বাভাবিক হবে—তা নির্ভর করছে সীমান্ত নিরাপত্তা, নৌপথের সক্ষমতা এবং মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর।

খোরশেদ হত্যা: “রাকিবদের ঘটনাস্থলে দেখেছে তারেক”

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারের আলোচিত ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও ছাত্রদল কর্মী খোরশেদ আলম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার প্রধান আসামি তারেকের বক্তব্য নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছে পুলিশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তারেক পুলিশকে বলেছেন—ঘটনার সময় তিনি অন্য আসামি রাকিবসহ কয়েকজনকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন।

এ নিয়ে ওই কর্মকর্তার প্রশ্ন, “সে যদি ঘটনায় জড়িত না থাকে, তাহলে ঘটনাস্থলে অন্যদের কিভাবে দেখলো? সে কি দূরবীন দিয়ে দেখেছে?”

প্রযুক্তির সূত্রে রাকিবের উপস্থিতির তথ্য

তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার দিন রাকিবের ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।

মোবাইল ফোনের লোকেশন ডাটা ও অন্যান্য ডিজিটাল ট্রেইল বিশ্লেষণ করে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে দাবি তদন্ত সংশ্লিষ্টদের।

পুলিশের মতে, এ তথ্য মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং রাকিবের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা যাচাইয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

দুইজনকে ঘিরে তদন্ত, ‘সঠিক লাইনে’ থাকার দাবি পুলিশের

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এই মামলায় আপাতত দুইজনকে ঘিরেই তদন্ত এগোচ্ছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বে ইনসাইটকে বলেন, “মামলায় জড়িত সন্দেহে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত যা পেয়েছি, তাতে মনে হচ্ছে আমরা সঠিক লাইনে আছি। তদন্ত চলছে, আরও গভীরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।”

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চিন্ময় বড়ুয়া জানান, প্রধান আসামি তারেককে ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্য আসামি রাকিবকে একটি পৃথক মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণের সময় সেখান থেকেই আটক করা হয়।

তবে এখনো তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়নি। শিগগিরই রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান তিনি।

সম্পর্ক ও যোগাযোগ: ‘তারিনকে ফোন দিয়ে ডাকে খোরশেদ’

তদন্তে সংশ্লিষ্টদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্কও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ করে ‘তারিন’ নামে এক নারীর সঙ্গে খোরশেদের যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও এখনো তার সম্পৃক্ততার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা দেখছি তাদের (খোরশেদ ও তারিন) মধ্যে আগে থেকে সম্পর্ক ছিল। মাঝখানে কিছুটা বিরতি ছিল। এখন পর্যন্ত তারিনের সম্পৃক্ততা পাইনি, তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”

বে ইনসাইটের প্রশ্নে তিনি জানান, “তারিনকে ফোন দিয়ে ডাকে খোরশেদ

তিনি আরও বলেন, “কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে তো আমরা অপরাধী বানাতে পারি না। আমাদের উপর আস্থা রাখুন।”

সিসিটিভি বিশ্লেষণ: মাঝপথেই ‘গ্যাপ’

ঘটনার আগে ও পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে তদন্তকারী সংস্থা। তবে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এদিকে বে ইনসাইটের হাতে আসা কিছু ফুটেজ যাচাই করে দেখা গেছে, ঘটনার দিন প্রধান অভিযুক্ত ‘কাকা তারেক’কে রাত সাড়ে ৯টার আগেপরে সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের সামনে দেখা যায়।

কিন্তু এরপরের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই সময়ের ফুটেজ মুছে গেছে।

স্থানীয় কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, তারেক সেখানে কিছু সময় লুডু খেলছিলেন। তবে কেউ সুনির্দিষ্ট সময় বলতে পারেননি।

সহবাসীর দাবি: “জামিন পেয়ে খুশি ছিল তারেক, নাচও করেছে”

ঘটনার দিন তারেকের গতিবিধি নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন তার এক সহবাসী।

তার দাবি, “সেদিন কলাতলির একটি ঘটনায় হওয়া মামলায় জামিন পাওয়ার পর কোর্ট থেকে ফিরে সন্ধ্যায় বাসায় গিয়ে গোসল করে ‘ফ্রেশ’ হন তারেক, এমনকি কিছু সময় নাচও করেন এবং ঘুমান।”

পরে তারেকসহ তারা তিনজন অটোরিকশায় ঝাউতলা থেকে সুগন্ধা এলাকার প্রাসাদ প্যারাডাইসের সামনে যান।

সেখানে গিয়ে তারেক কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে লুডু খেলতে বসেন, আর ওই সহবাসী অন্য একজনের সঙ্গে সৈকতের দিকে যান।

তিনি বলেন, “পরে এসে দেখি তারা নেই। ফোন দিলে তারেক জানায়, সে ঝাউতলার বাসায় ফিরে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “কীভাবে গেছে, তা আমি দেখিনি। তবে সিসিটিভিতে থাকতে পারে।”

এ সময় ‘ফকির গ্রুপ’-এর কিছু সদস্য বাইকে এসে তারেককে খুঁজেছেন বলেও জানান তিনি।

মায়ের দাবি: “বাড়িতে এসে খেয়ে ঘুমিয়েছে”

অন্যদিকে, তারেকের মা ছেলেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

তিনি বলেন, “আমার ছেলে বলেছে, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে লুডু খেলা শেষ করে ঝাউতলার বাসায় যায়, তারপর গোসল করে রামুতে বাড়িতে আসে।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর সে কক্সবাজার থেকে রামুর বাড়িতে আসে এবং তারেক খাবার চান । পরে ঘুমিয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, “আমি তাকে বিছানা করে দিই। এরপর সে ঘুমিয়ে পড়ে। আমার ছেলে নির্দোষ।”

সহবাসী ও মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন তারেক দুইবার গোসল করেন—একবার সন্ধ্যায় বের হওয়ার আগে, আরেকবার রাত ১১টার দিকে বাসায় ফেরার পর।

পূর্বের অপরাধের রেকর্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের আগের অপরাধমূলক ইতিহাসও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “এই গ্রুপটির আগেও বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডের তথ্য আছে। তাদের রেকর্ড ভালো না।”

প্রাথমিকভাবে সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত, তবে তদন্ত চলমান

তদন্তকারীরা বলছেন, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।

এক কর্মকর্তা বলেন, “সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে তারাই জড়িত। তবে আমরা আরও গভীরভাবে তদন্ত করছি।”

ঘটনার পটভূমি

গত ২৪ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কবিতা চত্বরে ছুরিকাঘাতে নিহত হন খোরশেদ আলম।

তিনি সদর উপজেলার ইসুলোর ঘোনা এলাকার বাসিন্দা শাহ আলমের ছেলে এবং ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাকে ঘিরে ফেলে হামলা চালায় এবং একপর্যায়ে ছুরিকাঘাত করে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার সময় তার সঙ্গে থাকা তারিন নামে এক নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।

তারিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “একদল দুর্বৃত্ত তাদের ঘিরে ধরে মূল্যবান জিনিস দাবি করে। এক পর্যায়ে ‘আরিফ’ নামে একজনকে মারধরের অভিযোগ তুলে খোরশেদকে ছুরিকাঘাত করা হয়।”

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি ছমিউদ্দিন বলেন, “প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের ঘনিষ্ঠদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ চলছে।”

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাম নয়, বাড়ছে জলবসন্ত; তিন মাসে আক্রান্ত ৮ হাজারের বেশি

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হাম নয়, এখন নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ভ্যারিসেলা জোস্টার ভাইরাসজনিত রোগ জলবসন্ত (চিকেনপক্স)।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই রোগের সংক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা ক্যাম্পের ঘনবসতি ও শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের স্বাস্থ্য সমন্বয়ক ডা. তোহা ভূঁইয়া জানান, “গত তিন মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জলবসন্তে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৭৬৯ জন। অথচ গত বছরের শেষ ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৩৫৫।”

তিনি বলেন, “তুলনামূলকভাবে হাম বা রুবেলার সংক্রমণ এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত তিন মাসে হাম আক্রান্ত শিশু পাওয়া গেছে ৪ জন এবং রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছে ১ জন।”

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে হাম ও রুবেলা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জলবসন্তের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

ডা. তোহা ভূঁইয়া জানান, ক্যাম্পে বসবাসরত শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকাদান কার্যক্রম চলছে।

ঘনবসতি ও বাস্তবতা: দ্রুত ছড়াচ্ছে সংক্রমণ

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সংকীর্ণ বসবাস, একসঙ্গে অনেক মানুষের থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানতে না পারা—এসব কারণে জলবসন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা নূরজাহান বলেন, “আমার ছেলের শরীরে হঠাৎ ফুসকুড়ি ওঠে, পরে জ্বর আসে। এখন আলাদা করে রাখতে হচ্ছে, কিন্তু এক ঘরে সবাই থাকায় সেটা খুব কঠিন।”

আরেক অভিভাবক মোহাম্মদ ইদ্রিসের ভাষ্য, “একজনের হলে দ্রুত অন্যদেরও হয়ে যায়। বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”

কী এই জলবসন্ত

চিকেন পক্স বা জলবসন্ত ভ্যারিসেলা-জোস্টার ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা সাধারণত শীতের শেষে ও বসন্তকালে বেশি দেখা যায়।

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে হাঁচি-কাশি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

লক্ষণ ও সংক্রমণের সময়কাল

জলবসন্তের লক্ষণ সাধারণত ১০ থেকে ২১ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায় এবং ১ থেকে ২ সপ্তাহ স্থায়ী হয়।

প্রধান লক্ষণগুলো হলো-
জ্বর
মাথাব্যথা
শরীর ম্যাজম্যাজ করা
চুলকানিযুক্ত তরলপূর্ণ ছোট ফোসকা
জলবসন্তের ধাপগুলো কীভাবে এগোয়

ইনকিউবেশন পিরিয়ড (সুপ্তাবস্থা):
ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর ১০-২১ দিন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

প্রাথমিক লক্ষণ :
ফুসকুড়ি ওঠার ১-২ দিন আগে জ্বর, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা ও মাথাব্যথা শুরু হয়।

ফুসকুড়ি বা ফোসকা পর্যায়:

প্রথমে লালচে দানা (র‍্যাশ)
পরে তরলপূর্ণ ফোসকা
শেষে শুকিয়ে খোসা (স্ক্যাব) হয়ে ঝরে পড়ে
আক্রান্ত হলে করণীয় কী

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত ব্যক্তির যত্নে কিছু বিষয় জরুরি-

১। আক্রান্তকে আলাদা রাখা
২। নখ ছোট রাখা, যাতে চুলকানোর ক্ষত না হয়
৩। প্রচুর পানি ও তরল খাবার গ্রহণ
৪। চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বর ও চুলকানির ওষুধ গ্রহণ
৫। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা
৬। প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবসন্ত প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভ্যারিসেলা টিকা গ্রহণ।

একই সঙ্গে সতর্কতা হিসেবে তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা ফোসকা থেকে অতিরিক্ত পুঁজ বের হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজন বাড়তি নজরদারি

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, ক্যাম্পে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেতনতা বাড়ানো, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং আলাদা রাখার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

নচেৎ, সীমিত জায়গায় বসবাসরত হাজারো মানুষের মধ্যে এই রোগ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চার শিশুর মৃত্যু, কক্সবাজারে আতঙ্ক বাড়ছে

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারে হামের প্রকোপ বাড়লেও আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। অনেক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেও পরীক্ষায় সব ক্ষেত্রে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত ৯২টি স্যাম্পল পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি। এর মধ্যে ৩০টি পজিটিভ এসেছে, বাকিগুলো নেগেটিভ বা রিপোর্ট এখনো আসেনি। তাই সব মৃত্যুকে সরাসরি হামের কারণে হয়েছে, এভাবে বলা যাচ্ছে না।”

৯২ নমুনায় ৩০ পজিটিভ

স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, জেলায় হামের সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। নমুনা পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত ৩০টি পজিটিভ এলেও অনেক ক্ষেত্রে রিপোর্ট আসতে দেরি হচ্ছে, ফলে চিত্র পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

ডা. আলমগীর বলেন, “অনেক রোগী উপসর্গ নিয়ে আসছে, কিন্তু পরীক্ষায় সব পজিটিভ হচ্ছে না। তাই নিশ্চিত হতে আমাদের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।”

উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু, রিপোর্ট অনিশ্চিত

সম্প্রতি মারা যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ৭ মাস বয়সী হিরা মনি হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেও তার নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল এসেছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে সর্বশেষ মারা যাওয়া ৯ মাস বয়সী শিশু জেসিনের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনো হাতে আসেনি। তাকে আপাতত “সন্দেহভাজন” হিসেবে ধরা হচ্ছে।

“উপসর্গ দেখে আমরা ধারণা করছি, কিন্তু ল্যাব কনফার্মেশন ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না,” বলেন সিভিল সার্জন।

জেসিনের মৃত্যু: নিউমোনিয়ার জটিলতা

মহেশখালীর ছোট মহেশখালী এলাকার বাসিন্দা নাসিরের কন্যা জেসিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

ডা. মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, “এ ধরনের ক্ষেত্রে অনেক সময় নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।”

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হামের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া একটি সাধারণ কিন্তু মারাত্মক জটিলতা, যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত জেলায় মোট ১৩৯ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত তিন দিনেই পাওয়া গেছে ৮৬ জন, যা সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ডা. আলমগীর বলেন, “আমরা মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়িয়েছি এবং দ্রুত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে।”

এখন পর্যন্ত ৪ শিশুর মৃত্যু

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কক্সবাজারে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪টি শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব মৃত্যুর সবগুলো সরাসরি হামের কারণে হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে ল্যাব রিপোর্টের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ডা. আলমগীর বলেন, “মৃত্যুর ঘটনাগুলো আমরা গুরুত্বসহকারে যাচাই করছি। উপসর্গ থাকলেও ল্যাব কনফার্মেশন ছাড়া চূড়ান্তভাবে কারণ বলা সম্ভব নয়।”

“জটিলতাই বড় ঝুঁকি”

ডা. আলমগীর বলেন, “অনেক সময় দেখা যায়, সরাসরি হামের কারণে নয়, বরং নিউমোনিয়ার মতো জটিলতার কারণেই শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।”

সতর্কতা জোরদার

পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সচেতনতামূলক কার্যক্রম, নমুনা পরীক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া, টিকাদান নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই হামের বিস্তার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

কক্সবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে, যেখানে প্রতিটি সন্দেহভাজন কেসই হতে পারে বড় সংক্রমণের ইঙ্গিত।

কক্সবাজারে ৭০% ট্রলার বন্ধ, তেল সংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় বিপাকে জেলেরা

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

তেল সংকট, সাগরে মাছের স্বল্পতা ও ডাকাতের উপদ্রবের কারণে কক্সবাজারে অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে ও তাদের পরিবার।

কক্সবাজার ফিশিং বোটমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি হিসাবে জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ ট্রলার সাগরে যেতে পারছে, আর ৭০ শতাংশ ট্রলার বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, আগে যেসব ট্রলার তেল সংগ্রহ করতে পেরেছিল, সেগুলোর কিছু এখনও চলমান থাকলেও নতুন করে তেল না পাওয়ায় অধিকাংশ ট্রলার অচল হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে পুরো জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০টি ট্রলার সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।

তেল সংকটে থমকে যাচ্ছে মাছ ধরা

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্রলার পরিচালনায় সবচেয়ে বড় সংকট এখন জ্বালানি তেল।

“ম্যাক্সিমাম ট্রলারের কাছেই তেল নেই। যারা পাচ্ছেন, তারাও পর্যাপ্ত পাচ্ছেন না; অনেক ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ বা ১০ দিনে অল্প পরিমাণ তেল মিলছে।”

তিনি জানান, সমুদ্রে ভাসমান তেল সরবরাহ ব্যবস্থাও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

তার ভাষায়, তেলের পাশাপাশি সাগরে মাছের অপ্রতুলতা এবং ডাকাতের উপদ্রবও ট্রলার চলাচল কমে যাওয়ার বড় কারণ।

ঝুঁকি ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক মালিক ট্রলার সাগরে পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

হাজার হাজার জেলে কর্মহীন

দেলোয়ার হোসেন বলেন, কক্সবাজারে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৮১৮ জন। তবে নিবন্ধনের বাইরে আরও অনেক জেলে রয়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত ১০ থেকে ২০ হাজার জেলে সাগরে যেতে পারছেন না, ফলে তারা কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

সামনে আসছে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা

তিনি জানান, ১৪ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে, যা মাছের প্রজনন মৌসুমকে কেন্দ্র করে দেওয়া হয়।

“যেসব ট্রলার এখন সাগরে আছে, সেগুলো ফিরে এলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে আবার যেতে পারবে না,” বলেন তিনি।

নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার দাবি

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা ছোট জেলেদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

তার মতে, সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে দেশের মাছের সরবরাহ কমে যাবে, যার প্রভাব পড়বে বাজারে।
এ কারণে তিনি সরকারের কাছে এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

জেলেদের হতাশা: “সমুদ্রে যেতে না পারলে ঘরে খাবার নাই”

কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক এলাকার জেলে মোহাম্মদ হানিফ বলেন, “আগে সপ্তাহে দুই-তিনবার সাগরে যাইতাম। এখন তেল নাই, ট্রলার বন্ধ। ঘরে বসে থাকি, কাম নাই, আয় নাই।”

কক্সবাজার ফিশারী ঘাটে অপেক্ষমান জেলে আবদুল কাদের বলেন, “সমুদ্রে গেলেও ভয় আছে। ডাকাতের উপদ্রব বাড়ছে। আর মাছও আগের মতো পাওয়া যায় না। খরচ উঠে না, তাই অনেকে যাইতেছে না।”

জেলে নুরুল আমিন বলেন, “আমরা দৈনিক খাই-দৈনিক চলি। ১০-১৫ দিন সাগরে যেতে না পারলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। এখন অনেকেই ধার-দেনা করে চলতেছে।”

কুতুবদিয়ার জেলে সালামত উল্লাহ বলেন, “১৪ তারিখ থেকে আবার নিষেধাজ্ঞা আসতেছে। এই অবস্থায় যদি সাগরে যেতে না পারি, তাহলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো বুঝতেছি না।”

আরেক জেলে রশিদ আহমদ বলেন, “সরকার যদি তেলের ব্যবস্থা না করে বা কোনো সহায়তা না দেয়, তাহলে আমাদের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হইবো।”

কক্সবাজারে হামের থাবা: উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু, মৃত বেড়ে ৩, হাসপাতালে বাড়ছে চাপ

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারে আবারও হামের (মিজেলস) ছোবল। সংক্রামক এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় হামে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিনে। একইসঙ্গে হাসপাতালে বাড়ছে আক্রান্ত শিশুদের চাপ, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে জনস্বাস্থ্য খাতে।

ভোরে নিভে গেল জেসিনের জীবন

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ভোরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ডেডিকেটেড হাম ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ৯ মাস বয়সী শিশু জেসিন। সে মহেশখালীর ছোট মহেশখালী এলাকার বাসিন্দা নাসিরের কন্যা।

এর আগের দিন একই উপজেলার ৭ মাস বয়সী হিরা মনি নামের আরেক শিশুর মৃত্যু হয়। এছাড়া এর আগে আরও একটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, হামের পাশাপাশি অন্যান্য জটিলতা, বিশেষ করে নিউমোনিয়া এই মৃত্যুগুলোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

“হাম একা আসে না, সঙ্গে আনে জটিলতা”

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মোহাম্মদ শহিদুল আলম বলেন, “এ পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের অনেকের মধ্যে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত ছিল। অনেক সময় হাম সরাসরি নয়, বরং এর জটিলতাই জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

তার মতে, অপুষ্টি, দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং সেকেন্ডারি সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

হাসপাতালে রোগীর ঢল

জেলায় হামের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও দ্রুত বাড়ছে।

বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম ইউনিটে ভর্তি রয়েছে ৪২ শিশু। এছাড়া কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে আরও ৫ জন। সব মিলিয়ে দুই হাসপাতালে ভর্তি শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে।

হাসপাতাল সূত্র বলছে, প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে, যার ফলে শয্যা সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

আলাদা ওয়ার্ড, তবু চাপে চিকিৎসকরা

রোগীর চাপ সামাল দিতে ইতোমধ্যে সদর হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড ও আলাদা নার্সিং ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মং টিংঞো বলেন, আমরা হাম রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড ইউনিট চালু করেছি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আছে, কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

কেন বাড়ছে সংক্রমণ?

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, মৌসুমি পরিবর্তনের পাশাপাশি টিকাদানের ফাঁক, অপুষ্টি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের অবাধ মেলামেশা, সব মিলিয়ে হামের বিস্তার বাড়ছে।

বিশেষ করে মহেশখালীর মতো দ্বীপ ও প্রান্তিক এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নীরব ঝুঁকি: লক্ষণ প্রকাশের আগেই ছড়ায়

হামের বড় ঝুঁকি হলো, লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই আক্রান্ত শিশু অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে পরিবার বা আশপাশের অন্য শিশুরা দ্রুত সংক্রমিত হয়।

এখন কী জরুরি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ জরুরি—

  • ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন
  • আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা
  • প্রি-স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা
  • অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি

কক্সবাজারে হামের এই নতুন ঢেউ শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকটই নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। যেখানে প্রতিরোধই হতে পারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।